আজকের তুরস্ক যেখানে, সেই এলাকা পরিচিত ছিল আনাতোলিয়া (Anatolia) নামে। আজ থেকে তেরশো বছরেরও আগে সেখানে গড়ে উঠেছিল মুসলিম এক রাজ্য। উৎকর্ষতার চূড়ান্ত সময়ে তাদের ক্ষমতা জারি হয়েছিল আজকের ইরান, ইরাক এবং মধ্য এশিয়া জুড়ে। এটাই ছিল ইতিহাস বিখ্যাত সেই সেলজুক (Seljuk) সাম্রাজ্য। একাদশ থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত ছিল সেলজুকদের জয়জয়কার। এরপর সময়ের অমোঘ নিয়মে হারিয়ে যায় তারাও।
উৎপত্তি
মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমির (steppes) রুক্ষ পরিবেশে বাস করত যাযাবর নানা তুর্কি গোত্র। এদের একদল ঘুজ বা অউজ (Oğuz/Ghuzz)। এরা অনেক সময় যোদ্ধা হিসেবে খাজারদের ভাড়া খাটত। এই খাজাররা আরেকটি তুর্কি গোত্র। ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষদিকে রাশিয়ার একাংশ, কাজাখস্তান এবং ক্রিমিয়া নিয়ে তারা তৈরি করেছিল নিজ রাজ্য। অর্থে বিনিময়ে তাদের সেনাদলে নাম লিখিয়েছিল অনেক অউজ।
দশম শতকে অউজদের মধ্যে সমরকুশলতায় নাম করেছিলেন সেনাপতি দুকাক (Duqaq) এবং তাঁর ছেলে, সেলজুক। ৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে খাজাররা যখন বহিঃশত্রুর আক্রমণে বিপর্যস্ত তখন সুযোগ বুঝে তাঁরা বিদ্রোহ করে বসেন। সেলজুক ও দুকুয়া ৩০০ অশ্বারোহী, ১৫০০ উট আর ৫০০০০ ভেড়া নিয়ে চলে যান সমরখন্দ। একপর্যায়ে মধ্য এশিয়ার জাক্সার্টেস (Jaxartes /Syr Darya) নদীর তীরে এসে বসতি স্থাপন করেন তাঁরা।
অউজরা প্রাথমিক যুগে মুসলিম ছিল না। তবে সেলজুক ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর গোত্রের অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করে। এরাই পরে প্রতিষ্ঠা করে সেলজুক সালতানাত। সেলজুক নিজে অবশ্য সেটা দেখে যেতে পারেননি। তিনি মূলত ইরান আর উজবেকিস্থান জুড়ে প্রতিষ্ঠিত সামানিদ সাম্রাজ্যের সীমান্তরক্ষার ভার পেয়েছিলেন। পরে গজনীর সুলতান মাহমুদের সেনাদলেও কাজ করেছেন তিনি।
নতুন শক্তি
সালতানাতের ভিত রচনা করেছিলেন সেলজুকের দুই নাতি, চাগরি (Chagri Beg) এবং তুগ্রিল বেগ (Ṭugril Beg)। নতুন নতুন এলাকা দখল করেন তাঁরা। ১০৫৫ সাল নাগাদ বর্তমান ইরান, তুর্কমেনিস্তান এবং উত্তর আফগানিস্থানের বিশাল এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় দুই ভাইয়ের আধিপত্য। ইরানের নিশাপুরে রাজধানী বানিয়ে শাসন করতে থাকেন তাঁরা। একপর্যায়ে সুবিশাল এই রাজ্য পূর্ব আর পশ্চিমাংশে ভাগ হয়ে যায়। পূর্বাঞ্চল শাসিত হতো বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের মার্ভ শহর থেকে, আর পশ্চিমাঞ্চলের কেন্দ্র ছিল আজকের তেহরানের অদূরে রাই নগরী।
আব্বাসি খেলাফতের সাথে সম্পর্ক
বাগদাদের আব্বাসি খেলাফত তখন পতনোন্মুখ। ইরানে সেই সময় বুইদ (Buyd) রাজবংশের অধীনে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী একটি শিয়া রাজ্য। ৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসিদের হটিয়ে বাগদাদ দখল করে নেয় তারা। একশো বছরের কিছু বেশি সময় বজায় ছিল তাদের ক্ষমতা।
১০৫৫ সালের ডিসেম্বরে সুন্নি সেলজুকরা বুইদদের পরাস্ত করে। তুগ্রিল বেগ বাগদাদে প্রবেশ করে আটক করেন বুইদ শাসক, যুবরাজ মালিক আল-রহিমকে (al-Malik al-Raḥīm)। সেলজুক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে মসুল পর্যন্ত। ১০৫৭ সালে সেখানে সেলজুক গভর্নর বসিয়ে বাগদাদে ফিরে আসেন তুগ্রিল। আব্বাসি খলিফা আল কাইম (al-Qāʾim) ততোদিনে ফিরে এসেছেন রাজধানীতে। সেলজুক নেতাকে তিনি নানা খেতাবে ভূষিত করেন (king of the East and West)।
উৎকর্ষের শীর্ষে
সেলজুক সাম্রাজ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে সুলতান আলপ আরসালান (Alp-Arslan) এবং মালিক শাহর (Malik-Shah) হাতে। তাদের প্রতিপত্তি বিস্তৃত ছিল ইরান, ইরাক হয়ে সিরিয়া এমনকি ফিলিস্তিন পর্যন্ত।
১০৭১ সালে সুলতান আলপ আরসালান মাঞ্জিকার্টের বিখ্যাত যুদ্ধে বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনীকে পরাস্ত করলে এশিয়া মাইনরেও সম্প্রসারিত হয় সেলজুক প্রভাব। রোমান সম্রাট চতুর্থ ডায়োজেনেস (Romanus IV Diogenes) সেলজুকদের হাতে ধৃত হন। তাঁর মুক্তির বিনিময়ে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে নেয় সেলজুকরা।
সেলজুক অধিকৃত এলাকাগুলো একটি কনফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কেন্দ্রীয়ভাবে শাসিত একক রাজ্য বলতে যা বোঝায় সেলজুকরা ঠিক তেমন ছিল না। ফলে প্রশাসন পরিচালনা করা ছিল কঠিন। আলপ আরসালান এবং মালিক শাহের সময় সুচারুরূপে সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাদের প্রধান উজির, নিজাম উল মূলক। তিনি প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত করেছিলেন অভিজ্ঞ পারসিক কর্মকর্তাদের। সামরিক বাহিনীতে আবার ছিল তুর্কি গোত্রগুলোর আধিপত্য।
সেলজুক রাজদরবারে পূর্ববর্তী পারসিকদের বহু প্রথা প্রচলিত ছিল। পারসিক ভাষা এবং সংস্কৃতির অনেক কিছুই গ্রহণ করে নিয়েছিল তাঁরা। ফার্সি তাদের রাজকীয় ভাষার মর্যাদা পায়। সেলজুকদের অধীনস্থ আরবিভাষী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে ফার্সি। ধর্মীয় বিষয় ছাড়া প্রায় হারিয়ে যায় আরবির ব্যবহার।
সেলজুক সুলতানরা জ্ঞানবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অনেক মাদ্রাসা, মসজিদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁরা, সেখানে শিক্ষা গ্রহণ করতো বহু শিক্ষার্থী। ইস্পাহানের জামে মসজিদে সেলজুকদের অর্থায়নেই গড়ে উঠেছিল।
পতন
সেলজুকদের অবক্ষয় শুরু হয় নিজাম উল মূলকের সময়েই। মালিক শাহর স্ত্রী তের্কেন হাতুনের (Terken Hatun) সাথে মনোমালিন্য ছিল তাঁর, যার প্রভাব পড়েছিল প্রশাসনে। ১০৯২ সালে সম্ভবত ইসমাইলি শিয়াদের পাঠানো আততায়ী উজির এবং সুলতান দুজনকেই হত্যা করে। এরপর থেকে দুর্বল হতে থাকে সেলজুক সাম্রাজ্য। মালিক শাহর ভাই এবং চার সন্তান ক্ষমতা নিয়ে জড়িয়ে পড়েন গৃহযুদ্ধে। এর পরিণতিতে ভেঙে যায় রাজ্য।
প্রথম এবং দ্বিতীয় ক্রুসেডেও এলাকা হারায় সেলজুকরা। ১০৯৭ সালে ক্রুসেডারদের চাপে এশিয়া মাইনরের সেলজুক এলাকা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র একটি অংশে। তাদের পশ্চিমে ছিল বাইজান্টাইনরা, আর পূর্বে সিরিয়ার ক্রুসেডার রাজ্যগুলো। এই সেলজুক রাজ্য পরিচিত ছিল রুম (Sultanate of Rum) নামে। ১০৮১ থেকে ১৩০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল রুম, তবে এর সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন।
সেলজুকদের ইরানি রাজ্য ছিল রুমের থেকে ভিন্ন। সেখানকার সেলজুকরা কিরমান শহরে বসে শাসন করতো। তবে বিভিন্ন বিদ্রোহ দুর্বল করে দিয়েছিল তাদের। ১১৫৪ সালে তাদের শেষ সুলতান মারা গেলে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই সেলজুক বংশধারা। সেখানে মাথা তোলে খাওয়ারেজম রাজবংশ (Khwārezm-Shah dynasty)।
১১৯৪ সালে রুমের পূর্বাঞ্চল দখল করে নেয় খাওয়ারেজম সাম্রাজ্য। ১২৩০ সালে রুমের সুলতান প্রথম কায়কোবাদ (Alaʾ al-Dīn Kay-Qubādh) তাদের সাথে লড়াই শুরু করেন। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছিয়ে আসতে হয় তাকে। এর মধ্যেই উপস্থিত হয় নতুন বিপদ, মোঙ্গল। ১২৪৩ সালে মোঙ্গলদের সাথে সংঘটিত যুদ্ধে (Battle of Köse Dagh) চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হয়ে যায় রুমের সেলজুকরা।
References
- Encyclopedia Britannica.
- Szczepanski, K. (2019). Who Were the Seljuks?
- Basan, Osman Aziz. “The Great Seljuks in Turkish Historiography.” University of Edinburgh, 2002.
- Kuruk, H. N. (2025). The Great Seljuk Empire: History, Culture, Facts. The Collector