নেপাল, বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পার্বত্য রাষ্ট্রগুলোর একটি। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক নেপালে বেড়াতে যান। কিন্তু প্রাকৃতিক দিক থেকে অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী এই দেশটির রাজনৈতিক পরিমন্ডলে অস্থিরতা যেন লেগেই আছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে যে ব্যাপক গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, তাকে নেপালি সমাজে বহুদিন ধরে জমাট বাধা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।
নেপালের তরুণ প্রজন্মের দ্বারা সংগঠিত আন্দোলন ছিল মূলত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতার বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নেপালের সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের পটভূমি রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক হতাশা এবং সামাজিক অবিচারের মধ্য দিয়ে।
আন্দোলনের প্রধান এবং সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ ছিল ব্যাপক দুর্নীতি। সরকারি আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের উচ্চ স্তর পর্যন্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। জনগণের করের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য কীভাবে অসাধু চক্রের হাতে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। বিশেষত, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব, সরকারি ক্রয়ে অস্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন লাইসেন্স বা সেবার বিনিময়ে ঘুষ লেনদেন জনগণের আস্থা একেবারে তলানিতে নিয়ে আসে। এই দুর্নীতিকে ‘ক্যান্সার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে।
দুর্নীতির পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি (Nepotism) ছিল এই আন্দোলনের পেছনে আরেকটি প্রধান অনুঘটক। নেপালি রাজনীতি ও প্রশাসনে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও পরিবারের সদস্যদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা পারিবারিক পরিচয়কে যোগ্যতা ও মেধার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ায় সমাজে এক গভীর বৈষম্য তৈরি হয়। তরুণ, মেধাবী এবং যোগ্য প্রজন্ম সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই গোষ্ঠীতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ নিশ্চিত করার দাবি ওঠে। নেপালের তরুণ প্রজন্ম যখন দেখতে পায় শুধু মেধা না থাকা সত্ত্বেও স্রেফ স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে একদল সুবিধাভোগী মানুষ তাদের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করছে, তখন তাদের রাজপথে নেমে এর সুরাহা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
এই আন্দোলনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল নেপালের অর্থনীতির দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা। দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল অবস্থায় ছিল। কোভিড-১৯ মহামারী এবং পরবর্তীতে বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ক্রয়ক্ষমতা কমলেও জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনধারণ কঠিন হয়ে ওঠে। দেশে বেকারত্ব ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণদের মধ্যে একধরনের বিস্ফোরণোম্মুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা আন্দোলনকে বেগবান করে।
সরকার যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা চালায়, তখন তা তরুণ সমাজকে সরাসরি রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করে। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার সরকারি উদ্যোগকে মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। প্রতিবাদ সংগঠিত করা এবং দুর্নীতির তথ্য দ্রুত জনসাধারণের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সরকার যখন এটি বন্ধ করতে চাইল, তখন জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ আরও জোরালো হয়েছে।
২০১৫ সালের সংবিধান প্রণয়নের পরও নেপালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, জোটের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ক্ষমতা দখলের খেলায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও উন্নয়নমূলক কাজগুলো থমকে যায়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কার্যকর সুশাসনের অভাব জনগণের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো জনগণের সেবা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাই কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তীব্র হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক এই গণআন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নেতার নেতৃত্বে সংগঠিত হয়নি। বরং এটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন, যেখানে সুশীল সমাজ এবং অরাজনৈতিক জনগণের সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। এই অরাজনৈতিক চরিত্রের কারণেই এটি দ্রুত জনসমর্থন লাভ করে। আন্দোলনের মূল দাবিগুলো ছিল দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রতিষ্ঠা: সমস্ত দুর্নীতি ও অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি সরকারি নিয়োগ ও সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন নিশ্চিত করা।
অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর নীতি প্রণয়ন। আর রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে স্থায়ী ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা।
নেপালের সাম্প্রতিক আন্দোলন ছিল বহুবিধ সমস্যার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ। এটি ছিল দুর্নীতিতে ডুবে থাকা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের স্পষ্ট বার্তা। আন্দোলনটি একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে যে, নেপালের জনগণ আর কোনোভাবেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা অপশাসন সহ্য করবে না। জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেশটির নীতিনির্ধারকদের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে- হয় তারা এই আন্দোলনের মূল কারণগুলো দূর করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করবে, নয়তো ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের গণ-বিস্ফোরণের মুখোমুখি হবে। এই আন্দোলন নেপালের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তথ্যসূত্র
3) What we know about Nepal anti-corruption protests as PM resigns