বিশ্বের প্রাচীনতম ও রহস্যময় প্রস্তর-স্মৃতিস্তম্ভগুলোর স্টোনহেঞ্জ অন্যতম। আজ যা আমরা স্টোনহেঞ্জ হিসেবে চিনি, তা একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি গঠিত হয়েছে একাধিক পর্যায়ে। প্রায় ৫,০০০ বছর আগে নির্মিত হয় প্রথম হেঞ্জ কাঠামোটি। এরপর, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে, নব্যপ্রস্তর যুগের শেষ পর্বে, স্থাপন করা হয় অনন্য সেই প্রস্তরবৃত্ত। পরবর্তীকালে, তাম্র-প্রস্তর যুগের শুরুতে এর আশপাশে নির্মিত হয় বহু সমাধি-টিলা।
স্টোনহেঞ্জের পূর্ব কাহিনি
স্টোনহেঞ্জ এলাকার প্রাচীনতম কাঠামো হিসেবে মেসোলিথিক যুগে (প্রায় ৮৫০০–৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) কয়েকটি গর্ত তৈরি করা হয়। এর মধ্যে তিনটি গর্তে সম্ভবত বিশাল আকারের পাইন গাছের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। তবে এসব কাঠামোর সঙ্গে পরবর্তী স্টোনহেঞ্জ স্থাপনার কী সম্পর্ক, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। সেই সময় দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বেশির ভাগ ভূমি ঘন বনাঞ্চলে পরিপূর্ণ থাকলেও, স্টোনহেঞ্জ এলাকার চুনাপাথরের পাহাড়ি ভূমি ছিল তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত। সম্ভবত এই ভিন্নতাই একে আদিম নিওলিথিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে আকর্ষণ করেছিল।
প্রাচীনতম হেঞ্জ কাঠামো
আজ পর্যন্ত যেটিকে স্টোনহেঞ্জের প্রথম নির্ভরযোগ্য কাঠামো হিসেবে ধরা হয়, তা হলো এক বিশাল বৃত্তাকার খাঁজ, যা ভিতরে ও বাইরে দুটি মাটির বাঁধ দিয়ে ঘেরা ছিল। এটি নির্মিত হয় আনুমানিক ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই হেঞ্জ কাঠামোর ব্যাস ছিল প্রায় ১০০ মিটার। এতে ছিল দুটি প্রবেশপথ। এর ভেতরে ছিল কাঠের তৈরি কিছু স্থাপনা। এছাড়া মাটির বাঁধের ভেতরের দিকে তৈরি করা হয় ৫৬টি গর্ত, যেগুলোকে বলা হয় অব্রে হোলস। গবেষকদের ধারণা, এই গর্তগুলিতে খাড়া কাঠের খুঁটি বসানো হয়েছিল। এই গর্তগুলোর মধ্যে, আশপাশে এবং খাঁজের ভেতরে মানুষ তাদের মৃতদের দাহ করে সমাহিত করত। আজ পর্যন্ত প্রায় ৬৪টি দাহকৃত দেহাবশেষ পাওয়া গেছে এখানে। এ থেকে অনুমান করা হয়, স্টোনহেঞ্জে প্রায় ১৫০ জনের মতো ব্যক্তির সমাধি ছিল, যা একে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম নব্যপ্রস্তর যুগের কবরস্থান হিসেবে পরিচিতি প্রদান করে।
প্রস্তরের বিন্যাস ও নির্মাণ পর্যায়
প্রায় ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্টোনহেঞ্জের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয় এর পাথরের কাঠামো। এখানে বৃহৎ সারসেন শিলা এবং ক্ষুদ্র নীল শিলা নামক দুই প্রকার পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল। সারসেন শিলাগুলো বসানো হয় ঘোড়ার খুরের মতো বিন্যাসে। এর বাইরে দেওয়া হয় সারসিন শিলার আরেকটি বৃত্ত। এই দুইয়ের মাঝে দ্বৈতভাবে বিন্যস্ত হয় নীল শিলা। সম্ভবত এই সময়েই প্রবেশপথের কাছে কিছু সারসেন শিলা স্থাপন করা হয়, যেগুলোর সঙ্গে স্টেশন স্টোন নামক চারটি পাথর স্থাপিত হয়। এর ২০০–৩০০ বছর পরে কেন্দ্রীয় নীল শিলাগুলোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয়। প্রথমে বৃত্ত ও ডিম্বাকৃতির বিন্যাসে সাজানো হলেও, পরে আবার ঘোড়ার খুর আকৃতিতে সাজানো হয় একে। একই সময় নির্মিত হয় একটি বিশেষ ধরনের ভূমি-নির্মাণ পথ, যা স্টোনহেঞ্জকে সংযুক্ত করে দেয় রিভার অ্যাভনের সঙ্গে। প্রায় ১৮০০–১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, কেন্দ্রীয় পাথরগুলোর চারপাশে খোঁড়া হয় দুটি বৃত্তাকার গর্তের সারি, যাদের বলা হয় ‘ওয়াই হোলস’ ও ‘জেড হোলস’। এগুলোর ভেতরে পাওয়া হরিণের শিংয়ের কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে এই সময়কাল।
বিশাল পাথর কোথা থেকে, কীভাবেই বা এল?
স্টোনহেঞ্জের নির্মাণে পাথর বৃহৎ আকারের সারসেন শিলার ওজন ছিল প্রায় ২০–২৫ টন, এবং ছোট ব্লুস্টোনের ওজন ছিল প্রায় ২–৪ টনের মতো। গবেষকদের মতে, সারসেন শিলাগুলো আনা হয়েছিল ২৫ কিলোমিটার দূরের মার্লবোরো ডাউন এলাকা থেকে। আর ব্লুস্টোনগুলো এসেছে ২০০ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থান ওয়েলসের প্রেস্কেলি পাহাড় থেকে। সম্ভাব্য কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী, তৎকালীন মানুষ কাঠের গোলা, চামড়ার দড়ি ও জলপথ ব্যবহার করে এগুলো টেনেছিল। অন্যদিকে, আরেকটি তত্ত্ব বলছে, বরফযুগের হিমবাহের গতিবিধি এই পাথরগুলোকে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে ঠেলে এনেছিল। কিন্তু এই তত্ত্বগুলোর কোনটিই এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রমাণিত নয়।
প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্র
স্টোনহেঞ্জের নির্মাণ কৌশল এবং পাথরগুলোর বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছিল, যা সূর্যের গতি নির্দেশ করে। বিশেষ করে, গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘতম দিনে, যেখানে স্টোনহেঞ্জের হিল স্টোন দাঁড়িয়ে আছে, সূর্য উদিত হয় ঠিক সেই দিক থেকে। এটি ছিল একধরনের প্রস্তর ক্যালেন্ডার, যা মৌসুম চিহ্নিত করতে সাহায্য করত।
স্টোনহেঞ্জ নির্মাণের পরবর্তী ইতিহাস
স্টোনহেঞ্জের পাথরের বিন্যাস সম্পন্ন হওয়ার যুগে ইউরোপ মহাদেশ থেকে নতুন ধরনের মৃৎপাত্র, ধাতুবিদ্যার জ্ঞান এবং ব্যক্তিগত কবর দেয়ার প্রথা প্রবেশ করছিল ব্রিটেনে। সেসময় স্টোনহেঞ্জের চারপাশে গড়ে ওঠে ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ গম্বুজাকৃতি সমাধিচক্র। স্টোনহেঞ্জের চারটি সারসেন শিলায় শত শত কুঠারফল এবং কিছু খঞ্জরের চিত্র খোদাই করা হয়। এগুলোর ধরন ‘অ্যারেটন ডাউন’-এর ব্রোঞ্জ যুগের কুঠারের মতো, যাদের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৭৫০ সাল থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের মধ্যে। সম্ভবত, এই কুঠারগুলো সে যুগের সামাজিক ক্ষমতা, মর্যাদা কিংবা সমাধিচক্র-সংক্রান্ত কোনো আচরণবিধির প্রতীক ছিল।
মধ্যযুগ ও লোককথার স্টোনহেঞ্জ
মধ্যযুগে স্টোনহেঞ্জ নিয়ে গড়ে ওঠে নানা রকম কাহিনি। খ্রিস্টীয় ১১৩৬ সালে জিওফ্রি অব মনমাউথ তাঁর ‘হিস্ট্রি অব দ্য কিংস অব ব্রিটেন’ গ্রন্থে দাবি করেন, জাদুকর মার্লিন জাদুবলে এই সৌধ নির্মাণ করেন। চিত্রশিল্প ও পাণ্ডুলিপির মাধ্যমে এই ধারণা শত শত বছর ধরে প্রচলিত ছিল।
ধীরে ধীরে পরিবর্তন
মধ্য ব্রোঞ্জ যুগে সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব বদলাতে থাকে। বড় ধরনের স্মারক সৌধ নির্মাণের চেয়ে কৃষিকাজের পেছনে মানুষ শ্রম দিতে থাকে বেশি। রোমান যুগে, স্টোনহেঞ্জ বহুবার পরিদর্শিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এখানে প্রাপ্ত নানা রোমান সামগ্রী দেখে ধারণা করা যায়, এটি সম্ভবত রোমানো-ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আচার-আস্থানায় পরিণত হয়েছিল।
স্যাক্সন যুগ থেকে আধুনিক কাল
খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে অ্যাভন নদীর ধারে ছোট্ট শহর অ্যামসবুরি গড়ে ওঠে। এই সময়েই স্টোনহেঞ্জে এক শিরচ্ছিন্ন পুরুষের কবর পাওয়া যায়। এরপর থেকে এই অঞ্চলের চারণভূমি জুড়ে ভেড়ার খামার গড়ে উঠতে থাকে। স্টোনহেঞ্জ বিষয়ে প্রাচীনতম লিখিত দলিল পাওয়া যায় মধ্যযুগীয় লেখালেখিতে। চতুর্দশ শতকের পর থেকে চিত্রে ও লেখায় ক্রমশ বাড়তে থাকে স্টোনহেঞ্জের উল্লেখ ও চিত্রায়ণ।
বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী
১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সালিসবুরি প্লেইনে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এক বিশাল এলাকা অধিগ্রহণ করে। ফলে স্টোনহেঞ্জের আশেপাশে নির্মিত হয় সেনাঘাঁটি, গোলাবারুদের প্রশিক্ষণক্ষেত্র, সামরিক হাসপাতাল, বিমানঘাঁটি ও রেলপথ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্থাপিত স্টোনহেঞ্জ বিমানঘাঁটির অস্তিত্ব এখন না থাকলেও, লার্কহিল বিমানঘাঁটির কিছু কাঠামো এখনও টিকে আছে।
১৮৮০-এর দশকে কিছু পাথরকে কাঠের খুঁটির মাধ্যমে ঠেস দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ১৯০০ সালে একটি সারসেন শিলা ও তার উপরস্থ লিন্টেল পড়ে গেলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। স্যার এডমন্ড অ্যান্ট্রোবাস এবং অ্যান্তিকুয়ারিজ সোসাইটির সহায়তায় ১৯০১ সালে সবচেয়ে উঁচু টিলিথনটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দাঁড় করানো হয়।
নির্মাতা কারা?
স্টোনহেঞ্জ কে বা কারা নির্মাণ করেছিল, তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, এটি গোষ্ঠীভিত্তিক এবং ধর্মীয় বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষক সমাজ নির্মাণ করেছিল। কিছু তত্ত্বে বলা হয়, ড্রুইড নামক কেল্টিক পুরোহিতরাই স্টোনহেঞ্জ তৈরি করেছিল, যদিও প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে ড্রুইডদের আবির্ভাব হয়েছিল স্টোনহেঞ্জ নির্মাণের অনেক পরে। এমনকি কিছু জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এটিকে ভিনগ্রহবাসীর কাজ হিসেবেও চিত্রায়িত করা হয়, যদিও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
স্টোনহেঞ্জ শুধু একটি পাথরের স্থাপনা নয়, এটি মানব সভ্যতার প্রাচীন জ্ঞান, বিশ্বাস ও স্থাপত্য দক্ষতার এক নিঃশব্দ সাক্ষী। হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য, নির্মাণপ্রণালি ও নির্মাতাদের পরিচয় এখনো আমাদের কাছে এক রহস্য, যা ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলে আজও।
তথ্যসূত্র
- History of Stonehenge
- Where is Stonehenge, who built the prehistoric monument …
- Stonehenge – Location, Definition & Age
- Stonehenge