Ridge Bangla

নকশালবাড়ি আন্দোলনের ইতিবৃত্ত

১৯৬৭ সালের কথা৷ ব্রিটিশ-পরবর্তী ভারতে স্বাধীনতার দুই দশক পার হয়ে গেলেও নাগরিকদের অবস্থার উন্নয়ন চোখে পড়ে না। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রের উপর আস্থা হারিয়ে বামপন্থার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন অনেকেই। পশ্চিমবঙ্গ একসময় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ হিসেবে ব্রিটিশদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু তারপরও এই অঞ্চলে প্রকৃত উন্নয়ন হয়েছে অতি অল্পই। তৎকালীন জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশটির মূল অবলম্বন ছিল কৃষি। কিন্তু কৃষিজমিতে জোতদারদের দখলদারিত্বের কারণে স্থানীয় কৃষকদের বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছিল। ফলে নাগরিকসমাজে ক্রমেই পুঞ্জীভূত হচ্ছিল তীব্র ক্ষোভ, যা উদগীরণের জন্য দরকার ছিল একটা উপলক্ষের।

দার্জিলিংয়ের নকশালবাড়ি নামের একটি গ্রামে বিমল কিষাণ নামের একজন ব্যক্তি নিজের জমি চাষ করার অনুমতি পান আদালতের কাছ থেকে। কিন্তু বাধ সেধে বসে জোতদাররা৷ তারা আদালতের আদেশকে আমলে না নিয়ে জমি চাষ করতে বাধা দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় চারু মজুমদার ও কানু স্যানাল– এই দুজনের নেতৃত্বে গ্রামের নিম্নবর্গের মানুষেরা জোতদারদের উপর আক্রমণ চালায়।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর আন্দোলনকারীদের হামলায় নিহত হন, যা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টনক নড়িয়ে দেয়। আন্দোলনকারীদের উপর পাল্টা হামলা চালানো হয়, ব্যাপক ধড়-পাকড় শুরু হয় তাদের উপর। বিমল কিষাণের এই ঘটনাটি যেখানে ঘটেছিল, অর্থাৎ দার্জিলিংয়ের নকশালবাড়ি গ্রামে, সেখান থেকে প্রথমে তা ছড়িয়ে পরে পুরো পশ্চিমবঙ্গে। এরপর তা অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিসগড়সহ আরও অন্তত দশটি রাজ্যে ছড়িয়ে যায়।

এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন চারু মজুমদার ও কানু স্যানাল৷ তারা পরবর্তীতে প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। চারু মজুমদার তার রাজনৈতিক জীবনে প্রথমে সিপিআই’ (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) সাথে জড়িত থাকলেও মতপার্থক্যের কারণে পরবর্তীতে সিপিআইএমে (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, মার্ক্সবাদী) চলে আসেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি রাজনীতি থেকে সাময়িক সময়ের জন্য নিজেকে সরিয়ে নেন। এরপর চীনের মাও সে তুংয়ের দ্বারা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন। এরপর তিনি অনুধাবন করেন নির্বাচনি রাজনীতির মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, এর জন্য দরকার প্রকৃত বিপ্লব। শ্রেণীশত্রুমুক্ত সমাজ গঠনে প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নিতে হলে সেটার পক্ষেই তিনি অবস্থান নেন।

মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রাথমিকভাবে নকশালবাড়ি আন্দোলনকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অস্ত্রের মুখে অনেকখানি দমন করতে পারলেও শহুরে তরুণদের মাঝে তা অভূতপূর্ব সাড়া জাগায়। সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ পড়ার টেবিল ছেড়ে চলে আসে আন্দোলনে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হওয়া আদিবাসীরা আন্দোলনে স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে আন্দোলনের সশস্ত্র রূপ তৎকালীন ধনিক ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে হয়ে উঠেছিল মূর্তিমান আতঙ্কের অপর নাম। তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বিপুল পরিমাণ জমির অধিকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমি মুক্ত করে সেগুলো হতদরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকশ্রেণীর কাছে বন্টন করা। এটা করতে গিয়ে তাদের হাতে প্রচুর মানুষ হতাহতের শিকার হয়।

এই আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয়রা চীনা বিপ্লবের নেতা মাও সে তুংকে নিজেদের আদর্শ মানতেন। মাও সে তুং যেভাবে চীনের নিম্নবর্গের মানুষকে সাথে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সফল হয়েছিলেন, তারাও সেরকম বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মাও-কে নিয়ে নকশালপন্থীদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ভারতের সাধারণ মানুষেরা ভালোভাবে নেয়নি।

১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের কাছে ভারতের লজ্জাজনক পরাজয়ের ফলে চীনবিদ্বেষী মনোভাব যখন ভারতীয় সমাজে প্রবল আকার ধারণ করেছে, তখন চীনের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি বাড়তি সমর্থন ভারতীয় সমাজ মোটেও ভালোভাবে নেয়নি। ১৯৭২ সালে আন্দোলনের প্রধান দুই নেতার একজন কানু স্যানাল পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান। আর চারু মজুমদার ১৯৭২ সালে একজন বিশ্বাসঘাতক সহযোদ্ধার কারণে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। বারো দিন পুলিশি অত্যাচার সহ্য করার পর তার মৃত্যু হয়। বস্তুত তার মৃত্যুর পর এই আন্দোলন একদম থিতিয়ে পড়ে। বাকিরাও হয় আন্দোলন থেকে সরে আসেন, নয়তো গা ঢাকা দেন। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই এই আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

এই আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো– তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। কেউ বলেন, এই আন্দোলন পুরোপুরি গ্রামকেন্দ্রিক হলেও এর তাত্ত্বিক নেতৃত্বে ছিলেন শহর থেকে আসা মানুষেরা, যাদের সাথে গ্রামীণ সমাজের সম্পর্ক ছিল অতি অল্প। ফলে আন্দোলনকারীদের সাথে তাদের সাথে একটা দূরত্বের ব্যাপার ছিলই। আবার শ্রেণীশত্রু খতম করার নামে অসংখ্য ধনিক শ্রেণীর মানুষ নকশালপন্থীদের হাতে হতাহতের শিকার হলে সেটি সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

শহুরে মধ্যবিত্ত শুরু থেকেই এই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, কারণ এই আন্দোলন কোনোভাবে সফল হলে তাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। পুরো ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য এত বেশি, যেকোনো অভিন্ন লক্ষ্যে এত মানুষকে একটি ছাতার নিচে আনা রীতিমতো অসাধ্যই বলা চলে। বাস্তবতার নিরিখে এই আন্দোলনের সফলতার মুখ দেখার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না।

আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ভারতীয় সমাজে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে এই আন্দোলন। এই আন্দোলনে শহরের তরুণদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের ঘটনাগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আদিবাসীদের ভূমি দখলের হাত থেকে বাঁচাতে, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মাওবাদীরা যে লড়াই করে যাচ্ছেন, সেটাকেও বলা হয়ে থাকে নকশালপন্থী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। এছাড়া শিল্প-সাহিত্যেও এর প্রভাব ছিল অপরিসীম। মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ কিংবা সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ ‘দ্য নকশাল স্টোরিজ’ এই আন্দোলনকে নিয়েই তৈরি করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১) ভারতে নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর, এখনও প্রাসঙ্গিক?

২) নকশাল আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

৩) নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব

This post was viewed: 26

আরো পড়ুন