Ridge Bangla

হাম্মুরাবি: ব্যাবিলনের শ্রেষ্ঠ সম্রাট

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে মেসোপোটেমিয়ার উর্বর ভূমিতে গড়ে উঠেছিল জমকালো এক মহানগরী, ব্যবিলন। সুমেরের পতনের পর নতুন এক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল তারা। প্রাচীন ব্যবিলন একসময় হয়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়ার কেন্দ্রস্থল। দূরদূরান্তে প্রসারিত হয়েছিল এর ক্ষমতা। এই সাম্রাজ্য উৎকর্ষের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে সম্রাট হাম্মুরাবির সময়, ইতিহাসে যার শাসনকাল মেসোপোটেমিয়ার এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

ক্ষমতাগ্রহণ

১৮১০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ব্যবিলনের রাজপরিবারে জন্ম নেন হাম্মুরাবি। তাঁর বাবার নাম সিন-মুবালিত (Sin-Muballit)। টাইগ্রিস আর ইউফ্রেতিসের ধারে অবস্থিত ব্যবিলন তখন ছিল ছোট এক নগররাষ্ট্র। এর অন্যতম সম্পদ উর্বর জমি আর অবারিত জলপথে ব্যবসাবাণিজ্যের সুবিধে।

শক্তিশালী প্রতিবেশী লার্সা (Larsa), এশুনা (Eshnunna), মারি (Mari) এবং আশুর (Assur) প্রায়শই ছড়ি ঘোরাতো সিন-মুবালিতের মাথার ওপর। লার্সার শাসক রিম-সিনের (Rim Sin I) সাথে তো ব্যবিলনের জন্মশত্রুতা। সিন-মুবালিত এক পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। বিফল হয় তাঁর সমরাভিযান। বিজয়ী রিম-সিন ব্যবিলন আর লার্সার মধ্যবর্তী ইসিন (Isin) শহর দখল করে একেবারে তাঁর ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলতে থাকেন। বাধ্য হয়ে চুক্তিতে এলেন সিন-মুবালিত। শর্ত অনুযায়ী সিংহাসন ত্যাগ করেন তিনি, অভিষেক হয় হাম্মুরাবির। সময়টা তখন ১৭৯২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।

হাম্মুরাবি মনোযোগ দিলেন ব্যবিলনের শক্তিবৃদ্ধির কাজে। তাঁর জানা ছিল প্রতিবেশীদের মোকাবেলা করার মতো সামরিক এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্জন করতে না পারলে পিতার পরিণতিই বরণ করতে হবে। ব্যবিলনের নগরপ্রাচীর উঁচুসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষা শক্ত করেন তিনি, ঢেলে সাজাতে থাকেন সামরিক বাহিনী। কৃষিকাজের জন্য উন্নত সেচব্যবস্থা তৈরি করেন হাম্মুরাবি। নাগরিকদের জন্য নির্মিত হয় উপাসনালয় এবং দালানকোঠা।

কূটনৈতিক অঙ্গনেও ব্যস্ত ছিলেন হাম্মুরাবি। প্রতিবেশী নানা রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করলেন তিনি। হাবেভাবে কাউকে বুঝতেই দিলেন না মনে মনে সবাইকে বশীভূত করার কী বিশাল পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছেন তিনি!

রাজ্যবিস্তার

১৭৮৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উরুক (Uruk) শহর অধিকার করেন হাম্মুরাবি। রিম-সিনের হাত থেকে ছিনিয়ে নেন ইসিন। নতুন করে লার্সার সাথে শুরু হয় সংঘাত। তবে এক বছর পরেই অন্য দিকে মনোযোগ দেন হাম্মুরাবি। পূর্ব আর উত্তরপশ্চিমে সামরিক অভিযান চালানো শুরু করে ব্যবিলন।

তখনকার সময়ে নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ছিল খুব সাধারণ। এই সুযোগ কাজে লাগান হাম্মুরাবি। পরের প্রায় দুই-দশক বিভিন্ন সময় লার্সা, এশুনা, মারি এবং আশুরের সাথে মৈত্রী ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে যায়। এই সময় নিজের উত্তর-সীমান্তে প্রতিরক্ষা জোরালো করেন হাম্মুরাবি। এরপর অগ্রসর হন উত্তরের প্রতিবেশীদের দিকে।

১৭৬৪ সালে টাইগ্রিসের পূর্বে আশুর, এশানা আর এলাম মিলে জোট গঠন করে। ধাতুর খনির ওপর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ছিল জোটের লক্ষ্য। হাম্মুরাবি তাঁদের হটিয়ে দিয়ে সুসংহত করেন ক্ষমতা। পরের বছর তিনি আক্রমণ চালান লার্সার ওপর। প্রথমে বাঁধ দিয়ে শহরের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেন হাম্মুরাবি, এরপর হঠাৎ বাঁধ খুলে ভাসিয়ে দেন শত্রুদের, অথবা পানির অভাবে নগরবাসীরাই আত্মসমর্পণ করে। রাজধানী টিকে ছিল কয়েকমাস, এরপর সেটাও চলে যায় ব্যবিলনের হাতে।

হাম্মুরাবি এবার মারি কব্জা করতে মনস্থ করলেন। সিরিয়া কেন্দ্রিক এই রাজ্য ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র। রাজা জিম্রি-লিম (Zimri-Lim) ও হাম্মুরাবি একই গোত্রের, অ্যামোরাইট। জিম্রি-লিম বেশ কিছু যুদ্ধজয়ের পর প্রচুর ধনসম্পদ অধিকার করেছিলেন। ব্যবিলনের মতো তাঁর রাজ্যও ছিল নদীর কিনারায়, ফলে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে হাম্মুরাবির প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠেছিল মারি।

মেসোপোটেমিয়ায় ব্যবিলনের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতি হুমকি হতে পারে এই আশঙ্কা থেকে ১৭৬১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অতর্কিতে মারির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন হাম্মুরাবি। জিম্রি-লিমকে পরাস্ত করে ধুলোয় মিশিয়ে দেন তাঁর রাজ্য। এর দুই বছর পর তাঁর হাতে পতন হত আশুর এবং এশুনার।

১৭৫৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মেসোপোটেমিয়ার সিংহভাগ হাম্মুরাবিকে সম্রাট হিসেবে স্বীকার করে নেয়। দক্ষিণে পারস্য উপসাগর থেকে উত্তরে আসিরিয়া (বর্তমান ইরাক আর তুরস্কের অংশবিশেষ) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল ব্যবিলন সাম্রাজ্য। কিন্তু হিসেবে একটু ভুল করে ফেলেছিলেন সম্রাট। উত্তরের বহিঃশক্তির আর ব্যবিলনের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রাচীর ছিল এশুনা। তাঁদের পতনে সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্ত উন্মুক্ত হয়ে যায় শক্তিশালী হিট্টাইট এবং কাসাইট জাতির কাছে।

আইনপ্রণেতা

হাম্মুরাবি সম্ভবত সবথেকে বিখ্যাত তাঁর প্রণীত আইনবিধি, বা কোড অব হাম্মুরাবি’র (Code of Hammurabi) জন্য। এমন না যে এর আগে এমন নীতিমালা ছিলনা, তবে এর কোনোটিই হাম্মুরাবির মতো ব্যাপক এবং সুসংগঠিত ছিলনা।

মোটমাট ২৮২ টি আইন লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। বিশাল পাথরের ওপর খোদাই করে লেখা বিধিমালা উন্মুক্তস্থানে প্রদর্শিত হয় জনসাধারণের জন্য। সম্পত্তির উত্তরাধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়েশাদি, অপরাধের শাস্তি কোনোটাই বাদ যায়নি হাম্মুরাবির কোড থেকে।  বিধবা, এতিম আর দরিদ্রদের সুরক্ষার জন্য নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত ছিল কোডে। বিভিন্ন পেশাজীবী, যেমন ব্যবসায়ী, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদির পেশাগত আচরণের সীমারেখাও বেঁধে দিয়েছিলেন সম্রাট। পেশাগত সততা বজায় না রাখলে কঠোর ফল ভোগ করতে হতো। যেমন, যদি কোনো মিস্ত্রী যেনতেন উপায়ে বাড়ি নির্মাণ করে, এবং সেই বাড়ি ভেঙ্গে মালিক মারা যায়, তাহলে মিস্ত্রীর কল্লা নেয়া হবে। আর মালিকের সন্তান মারা গেলে সেই শাস্তি বর্তাবে মিস্ত্রীর সন্তানের ওপর।

অপরাধের পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তি হবে, এমনটাই ছিল আইনের মূলনীতি। স্বাধীন নাগরিক, মালিকানাধীন দাস, মুক্ত দাস কাউকেই ছাড় দেয়া হয়নি, তবে সামাজিক শ্রেণী অনুযায়ী শাস্তির পরিমাণ কমবেশি হতে পারত। বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তিও নির্দিষ্ট করে দেন সম্রাট। যেমন, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত।

হাম্মুরাবি শহরের সৌন্দর্যবর্ধন এবং নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর নানা প্রকল্পও চালু করেছিলেন। কৃষিকাজের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাড়িয়েছিলেন ফলন। তাঁর সময় ছিল ব্যবিলনের স্বর্ণযুগ। সামরিক তো বটেই, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও মেসোপোটেমিয়ার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল ব্যবিলন। তাঁদের মূল দেবতা মারদুক হয়ে উঠেছিলেন অন্যান্য মেসোপোটেমিয়ান নগরের উপাস্য। ফলে ধর্মীয় দিক থেকেও আলাদা মর্যাদা লাভ করে ব্যবিলন।

অবদান

১৭৫৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পর থেকে অনেকটা আড়ালে চলে যান সম্রাট। রাজপুত্র সামসু-ইলুনাই (Samsu-Iluna) রাজকার্য পরিচালনা করতেন। ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পিতার মৃত্যুর পর সম্রাট হিসেবে আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয় তাঁর।

হাম্মুরাবির আইনবিধি তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। ব্যবিলনকে তৎকালীন মেসোপোটেমিয়ার অন্যতম শক্তিতে পরিণত করার কৃতিত্ব তাঁরই। হাম্মুরাবির ব্যবিলনের ছিল সুরম্য অট্টালিকা, অগণিত মন্দির, উন্নত প্রযুক্তির কৃষিব্যবস্থা এবং দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা। পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর কাছে ব্যবিলন ছিল ঈর্ষার পাত্র।

তবে প্রাচীন ব্যবিলন সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের পেছনেও দায় আছে হাম্মুরাবির। যুদ্ধবিগ্রহে বেশি সময় দিতে গিয়ে সুশৃঙ্খল একটি প্রশাসন গড়ে তুলতে পারেননি তিনি। ফলে প্রায় সব সিদ্ধান্তই এককভাবে নিতে হতো তাঁকে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত বিশাল যে সাম্রাজ্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেটা সামলানো সম্ভব ছিলনা, ফলে তাঁর উত্তরসূরিরা ধরে রাখতে পারেনি তাঁর অর্জন।

উত্তরদিক থেকে বিদেশী শত্রুর প্রবেশপথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন হাম্মুরাবি স্বয়ং, এশুনা ধ্বংস করে দিয়ে। এর জের টানতে হয়েছিল উত্তরসূরিদের। এই পথেই পরবর্তীতে ভেঙ্গে পড়েছিল প্রাচীন ব্যবিলন।

তবে একথা অস্বীকার করার জো নেই যে হাম্মুরাবির কারণেই মেসোপোটেমিয়ার শক্তির কেন্দ্র সরে এসেছিল ব্যবিলনে। ব্যবিলনের জাঁকজমকের যেসব গল্প প্রাচীন ইতিহাসবিদেরা লিখে গেছেন, তাঁর অধিকাংশই কিন্তু হাম্মুরাবির অবদান। তাঁর স্থাপিত ভিত্তির ওপরেই হাজার বছর টিকে ছিল এই সাম্রাজ্য।

References
  • Bertman, Stephen. Handbook to Life in Ancient Mesopotamia. Oxford University Press, 2005.
  • Encyclopedia Britannica.
  • Van De Mieroop, Marc. A History of the Ancient Near East, ca. 3000–323 BC. Wiley-Blackwell, 2015.
  • Kramer, Samuel Noah. History Begins at Sumer. University of Pennsylvania Press, 1981.
  • Charpin, Dominique. Writing, Law, and Kingship in Old Babylonian Mesopotamia. University of Chicago Press, 2010.
  • Snell, Daniel C. Life in the Ancient Near East, 3100–332 B.C.E. Yale University Press, 1997.
This post was viewed: 29

আরো পড়ুন