Ridge Bangla

ম্যারাথনের যুদ্ধ: গ্রীসে পারস্যের আগ্রাসনের সূচনা

আজকের এথেন্সের অদূরে অ্যাটিকার সমতলে আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল ভয়াবহ লড়াই। ম্যারাথনের ময়দানে স্বাধীনতা রক্ষায় পরাক্রমশালী পারস্য সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়েছিল এথেন্সের সেনাদল। সেদিনে সূর্যাস্ত দেখেছিল এক পরাশক্তির পিছু হটা, এবং গ্রীক  সভ্যতা-সংস্কৃতির এক নবদিগন্তের অভ্যুদয়।

প্রেক্ষাপট

ম্যারাথন বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘর্ষ নয়, বরং বহুদিন ধরে গ্রীস আর পারস্যের মধ্যে চলমান বিবাদের ফলাফল। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাসের (Cyrus the Great) প্রতিষ্ঠিত পারস্যের একিমিনিড সাম্রাজ্যে বিস্তৃত হয়েছিল এশিয়া মাইনরের অভ্যন্তরভাবে। বর্তমান তুরস্কের পশ্চিম উপকূলে তখন ছিল গ্রীক বেশ কিছু গ্রীক উপনিবেশ। পারস্যের অধীনস্থ হলেও মূল ভূখণ্ডের গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলোর সাথে তাদের সংযোগ ছিল অটুট।

৪৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এশিয়া মাইনরের গ্রীকরা পারস্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এথেন্স আর ইরিত্রিয়া তাদের সরাসরি সমর্থন করে। সম্রাট প্রথম দারিয়ুস তখন পারস্যের সিংহাসনে। পাঁচ বছর রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর তার লোকেরা বিদ্রোহ দমনে সক্ষম হয়।

দারিয়ুস এবার এথেন্স আর ইরিত্রিয়াকে শিক্ষা দিতে মনস্থ করলেন। এশিয়ার বাইরে ইউরোপে সাম্রাজ্যবিস্তারের অভিলাষও পূর্ণ হবে গ্রীস দখলের মাধ্যমে। এশিয়া মাইনরের গ্রীকদের বিদ্রোহের সাধ চিরতরে মিটিয়ে দিতেও তাদের উস্কানিদাতাদের পরাভূত করা দরকার।

দারিয়ুস প্রথমে দূত পাঠালেন গ্রীকদের কাছে- আমার বশ্যতা মেনে নাও, নাহলে পস্তাবে। রাজকীয় প্রতিনিধিদের হত্যা করে জবাব দিল গ্রীকরা। দারিয়ুসের হামলা ঠেকাতে যৌথ সেনাদলের ঘোষণা দিল এথেন্স আর স্পার্তা।

সামরিক অভিযান

প্রায় দুই বছর প্রস্তুতি নিয়ে ৪৯২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অভিযান শুরুর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু প্রবল ঝড়ে ভেস্তে যায় সেটা। এরপর দারিয়ুসের সেনারা সাইক্লাডেস আর ইউবোয়া দখল করে গ্রীক মূল ভূখণ্ডের কাছেই ঘাঁটি তৈরি করে।

৪৯০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পারস্যের নৌবহর রওনা হলো, প্রাথমিক লক্ষ্য এথেন্স আর ইরিত্রিয়া। প্রায় ৩০০০০ সৈন্যের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেনারেল দাতিস (Datis), অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান সম্রাটের ভাগ্নে, আর্টাফ্রেনেস (Artaphernes)।

৪৯০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আগস্ট/সেপ্টেম্বরে ইরিত্রিয়া তছনছ করে ম্যারাথনের প্রান্তরে অবতরণ করল পারস্য সেনারা, লক্ষ্য এথেন্স। সাহায্য চেয়ে খবর গেল অন্যান্য গ্রীক নগররাষ্ট্রের দিকে। স্পার্তা ব্যস্ত কার্নিয়া নামে এক ধর্মীয় আচারে, জানিয়ে দিলো উৎসব শেষ হলেও যাত্রা করবে তারা। এথেন্স নিজে জড়ো করতে পারল ৯০০০ লোক।

যুদ্ধ

এথেন্সবাসী মারাথনে ছাউনি ফেলল, এর মধ্যে ছোট্ট শহর প্লাতেয়া থেকে এলো ১০০০ সেনা। মূল বাহিনীর দায়িত্ব ভাগ করা ছিল দশজন জেনারেলের কাঁধে। গ্রীকদের কৌশল নিয়ে বচসা শুরু হয় তাদের মধ্যে। একদল চাইছিলেন স্পার্তা না আসা অবধি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ধরে রাখতে। দ্বিতীয় দল দ্রুত আক্রমণে যেতে আগ্রহী।

ক্যালিমেকাস (Callimachus) নামে এক অফিসারের ভোটে শেষ অবধি আক্রমণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর সেনা পরিচালনার ভার তুলে দেয়া হয় জেনারেল মিলতিয়াদেসের (Miltiades) ওপর। তিনি আগে দারিয়ুসের সেনাদলে কাজ করেছিলেন, ফলে পারসিকদের রণকৌশল সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিল তাঁর।

গ্রীকদের জানা ছিল পারস্যের মূল শক্তি তাদের অশ্বারোহী সেনা আর তীরন্দাজরা। তবে পদাতিক বাহিনী ছিল হাল্কা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত।

গ্রীক বাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু আবার ভারী অস্ত্রসজ্জিত পদাতিক বা হপলাইট (hoplites)। এরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তৈরি করতো ঘন এক রণসজ্জা, বা ফ্যালাংক্স।

সমস্যা হলো ম্যারাথনের উন্মুক্ত প্রান্তরে অশ্বারোহীরা সুবিধে পাবে। সুতরাং মিলতিয়াদেস উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করছিলেন। পারসিকরা অশ্বারোহী আর সেনাদের বড় একটা অংশ কয়েকটি জাহাজে উঠিয়ে এথেন্সের দিকে পাঠিয়ে দেন দাতিস, লক্ষ্য অরক্ষিত শহর নৌপথে কব্জা করা। ফলে আক্রমণ করা ফরজ হয়ে যায় গ্রীকদের জন্য।

সমবেত গ্রীকরা দ্রুত পারস্যের পদাতিক সেনাদের দিকে অগ্রসর হয়। মিলতিয়াদেস তার সারি যতদূর সম্ভব লম্বা করে দেন, যাতে সংখ্যায় বেশি পারস্য সেনারা ঘেরাও দিতে না পারে। দুই বাহুতে তিনি রাখলেন সবথেকে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের।

শত্রুবাহিনীর তীরের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গ্রীকরা শেষ ৪০০ মিটার দৌড়ে যায়, ফলে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় পারস্য সেনারা। তবে দ্রুতই নিজেদের সামলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। হাতাহাতি মারামারির এক পর্যায়ে গ্রীক ব্যুহের মধ্যভাগ ভেঙে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে তাদের বাহুর সেনারা বিপক্ষ বাহু কচুকাটা করে ফেলেছে। তারা দু’পাশ থেকে এগিয়ে এসে পেছন থেকে পারস্যের মধ্যভাগ আটকে দেয়।

বেকায়দায় পড়ে পালাতে থাকে শত্রুরা। নৌবহর ঘিরে সংঘটিত হয় ভয়াবহ লড়াই, এখানে নিহত হন ক্যালিমেকাস। বেঁচে থাকা অধিকাংশ পারসিকরাই উঠে পড়ে জাহাজে, চলে যায় গ্রীকদের নাগালের বাইরে। হেরোডোটাসের বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় ৬,৫০০ শত্রুসেনাকে হত্যা করেছিল তারা, বিনিময়ে হারাতে হয়েছিল ২০০ সহযোদ্ধাকে। তবে আধুনিক গবেষকদের মতে গ্রীকদের ক্ষয়ক্ষতি এত কম ছিল না।

এরিস্টিডাইসের অধীনে একদল সেনা রেখে বাকিদের নিয়ে দ্রুত এথেন্সের দিকে মার্চ করেন মিলিতিয়াদেস, যাতে পারসিক নৌবহরের আগেই পৌঁছতে পারেন সেখানে। সাত ঘন্টার মধ্যেই শহরে ফিরে এলেন তিনি।

দাতিস যখন এথেন্সের সামনে উপস্থিত হলেন তখন নগরপ্রাচীরে সশস্ত্র গ্রীক সৈন্যদের দেখতে পেলেন তিনি। পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন করা আক্রমণে যাওয়া সমীচীন মনে করলেন না দাতিস, আপাতত বাড়ি ফিরে গেল পারসিকরা।

ফলাফল

ম্যারাথনের যুদ্ধের পর গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এথেন্সের মর্যাদা বেড়ে যায় বহুগুণে। বহিঃশত্রুর বিপক্ষে প্রতিরক্ষা জোট গঠনের চিন্তাভাবনা শুরু হয়, যেখানে এথেন্স অনুমিতভাবেই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। তবে পারসিকরাও হাল ছেড়ে দেয়নি, আবার ফিরে এসেছিল তারা দারিয়ুসের ছেলের অধীনে।

ম্যারাথন দৌড়ের অনুপ্রেরণা কিন্তু ম্যারাথনের যুদ্ধ। কিংবদন্তী বলে বিজয়ের পর সেই সংবাদ এথেন্সে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল ফিডিপ্পাইডস (Pheidippides) নামে এক বার্তাবাহক, তার স্মরণেই প্রবর্তিত হয়ে এই দৌড়। বলে রাখা ভালো এই কাহিনীর সত্যাসত্য নিঃসন্দেহ নয়, এবং অনেক ঐতিহাসিকই এই গল্প ভুয়া বলে উড়িয়ে দেন।

References
  • Battle of Marathon. Encyclopedia Britannica.
  • “The Histories.” (Translation by Aubrey de Sélincourt), Penguin Classics, 1954.
  • Holland, Tom. “Persian Fire: The First World Empire and the Battle for the West.” Abacus, 2006.
  • Lazenby, J.F. “The Defence of Greece 490–479 BC.” Aris & Phillips, 1993.
  • Green, Peter. “The Greco-Persian Wars.” University of California Press, 1996.
This post was viewed: 29

আরো পড়ুন