বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সামরিক সক্ষমতায় স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে জেডিএএম বোমা ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির দাবি, আগামী দুই বছরের মধ্যে এ ধরনের বোমা বড় আকারে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে তারা।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধ পরিচালনায় ইসরায়েলের সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের নির্দেশনা এবং সাবেক বিচারপতি জ্যাকব টারকেলের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের শেষ দিকে নিজস্ব বোমা উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অস্ত্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল ইসরায়েল।
২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহ অভিযান নিয়ে মতবিরোধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে কিছু বোমা সরবরাহে আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকেই দেশটি নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন জোরদারে আরও গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
প্রথমদিকে সাধারণ বা ‘ডাম্ব’ বোমা তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা সম্প্রসারণ করে উন্নত প্রযুক্তির জেডিএএম ও অন্যান্য স্মার্ট বোমা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জেডিএএম মূলত এমন একটি গাইডেন্স কিট, যা সাধারণ আনগাইডেড বোমাকে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রে পরিণত করে। প্রতিকূল আবহাওয়াতেও এসব বোমা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। ইসরায়েল ইতোমধ্যে এ ধরনের কিছু কিট তৈরি করেছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাপক উৎপাদনের সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারেনি।
অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি শেকেলের দুটি বড় চুক্তি করে। এসব চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সামরিক সরঞ্জাম ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে দেশের স্বনির্ভরতা বাড়ানো।
এর আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক হাজার বিমান ও প্রায় ১৫০টি জাহাজের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা উপকরণ আনা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আমির বারাম বলেন, গত দুই বছরে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় পরিসরে কাজ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, ইসরায়েল একই সঙ্গে দুটি কৌশল অনুসরণ করছে। একদিকে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
ইরান ও লেবাননের সঙ্গে সংঘাতের অভিজ্ঞতার পর গোলাবারুদ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান বারাম। তিনি বলেন, আগাম প্রস্তুতি ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক অভিযানে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটে পড়তে হয়নি।
বারাম আরও বলেন, ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের কাজ চলছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অস্ত্র উৎপাদনের গতি আরও বাড়াবে।
তিনি সামরিক বাহিনী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের প্রশংসা করে বলেন, এই সমন্বয়ের ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত অস্ত্র ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছে।
তবে নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উৎপাদনের জন্য অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে, অল্প সময়ে কীভাবে দেশটি গোলাবারুদ উৎপাদন বাড়ানোর অর্থের জোগান দিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এর আগে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ‘অ্যারো-৩’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত অর্থের অভাব ছিল বলে জানিয়েছিল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।