দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত কৃষিকাজের কারণে তুরস্কের মধ্যাঞ্চলের কোনিয়া অঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে বিশাল আকৃতির ভূমিধস বা সিঙ্কহোল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশটির কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তুরস্কের ‘শস্যভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত কোনিয়া অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে একের পর এক গভীর গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোনিয়া অববাহিকায় এখন পর্যন্ত ৬৮৪টি সিঙ্কহোল শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ব্যাস ২২৮ মিটার এবং গভীরতা ১৭১ মিটার।
স্থানীয় কৃষক মেহমেত আকিফ ইশিকলি জানান, প্রায় ২০ বছর আগে তার জমিতে প্রথম বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে পাশের জমিতেও একই ধরনের সিঙ্কহোল দেখা দেয়। তার ভাষ্য, মাটি ধসে পড়ার সময় নিচ থেকে বুদবুদের মতো পানি ওপরে উঠছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনিয়া একটি বন্ধ অববাহিকা হওয়ায় এখানকার নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ সমুদ্রে পৌঁছায় না। এই পানির ওপরই নির্ভরশীল এলাকার হ্রদ, জলাভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা। কিন্তু অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে মাটির নিচের চুনাপাথরের স্তর দুর্বল হয়ে ধসে পড়ছে এবং সিঙ্কহোল তৈরি হচ্ছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্ক পানি-সংকটাপন্ন দেশে পরিণত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদি খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের তুরস্ক শাখার তথ্য অনুযায়ী, কোনিয়া অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ নলকূপ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬৬ হাজারই অবৈধ। ২০১৪ সালেই এ অঞ্চলে পানির ব্যবহার প্রাপ্যতার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল।
কোনিয়া টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ফেতুল্লাহ আরিক বলেন, এসব গর্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখন পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেক কৃষক আতঙ্কে সিঙ্কহোল মাটি দিয়ে ভরাট করার চেষ্টা করেন, যা আরও বড় ধসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান কৃষি নীতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। সরকার এখনো ভুট্টা ও সুগার বিটের মতো অধিক পানি প্রয়োজন এমন ফসলের চাষে ভর্তুকি দিচ্ছে। এর পরিবর্তে স্থানীয় গম বা আঙুরের মতো কম পানি প্রয়োজন হয় এমন ফসলের চাষে উৎসাহ দিলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে বিশেষ মানচিত্রও তৈরি করছেন কোনিয়া টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা।