Ridge Bangla

কামাল মাওলা মসজিদকে মন্দির ঘোষণা, ইতিহাস-ধর্ম ও রাজনীতির নতুন বিতর্ক

ভারতের মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্সকে ঘিরে বহু দশকের বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এই স্থাপনাকে দেবী সরস্বতীর মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে সেখানে মুসলিমদের নামাজ আদায়ের পূর্ববর্তী অনুমতিও বাতিল করা হয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ভারতের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

ধার জেলার ঐতিহাসিক এই স্থাপনা বহু বছর ধরেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দাবির কেন্দ্রে ছিল। হিন্দুদের একাংশের দাবি, এটি মূলত পরমার রাজা ভোজের প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র বা ‘ভোজশালা’, যেখানে দেবী সরস্বতীর পূজা হতো। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে একে কামাল মাওলা মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। একই স্থাপনাকে কেন্দ্র করে জৈন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও ঐতিহাসিক দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ রায়ে উল্লেখ করেছে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, শিলালিপি, ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক দলিল বিশ্লেষণ করে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে স্থাপনাটির মূল ধর্মীয় চরিত্র ছিল হিন্দু মন্দির। আদালতের মতে, সময়ের পরিবর্তনে কাঠামোর ব্যবহার বদলালেও সেখানে হিন্দু উপাসনার ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

এই রায়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই)-এর দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা। আদালতের নির্দেশে প্রায় ৯৮ দিন ধরে পরিচালিত এই সমীক্ষায় স্থাপনাটির বিভিন্ন স্তর পরীক্ষা করা হয়। পরে দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠার একটি বিশদ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বর্তমান কাঠামোর নিচে ও ভেতরে প্রাচীন মন্দিরের বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং পুরনো স্থাপনার অংশ ব্যবহার করেই পরবর্তীকালে বর্তমান কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে মুসলিম পক্ষ এই প্রতিবেদন ও আদালতের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে বর্তমান ধর্মীয় মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না। মুসলিম পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, শত শত বছর ধরে একটি স্থাপনা যেভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, সেই বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তারা আরও বলেন, অতীতের সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে সামনে এনে বর্তমান ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হলে তা ভবিষ্যতে আরও বহু বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

ভারতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালমান খুরশিদ আদালতে বাবরি মসজিদ মামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিশ্বাস বা ধর্মীয় অনুভূতি একাই আইনি মালিকানা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। তার মতে, শুধুমাত্র কোনো স্থাপনার নিচে পুরোনো কাঠামোর চিহ্ন পাওয়া গেলে সেটিকে বর্তমান ধর্মীয় অধিকারের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

তিনি ১৯৯১ সালের ‘প্লেসেস অব ওয়ারশিপ অ্যাক্ট’-এর কথাও উল্লেখ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার সময় যে ধর্মীয় অবস্থান ছিল তা অপরিবর্তিত রাখা এবং নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি ঠেকানো।

অন্যদিকে হিন্দু সংগঠনগুলো আদালতের এই রায়কে “ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার” হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, বহু বছর পর অবশেষে ভোজশালার প্রকৃত পরিচয় স্বীকৃতি পেল। তারা মনে করছে, এটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন