Ridge Bangla

ইরানে নবজাতকের জীবনরক্ষায় নীরব এক বিপ্লব এনেছে পারমাণবিক প্রযুক্তি

বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের নাম উচ্চারিত হলেই সাধারণত সামনে আসে পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ। কিন্তু এই একই পারমাণবিক প্রযুক্তি যে নীরবে হাজারো নবজাতকের জীবন বাঁচাচ্ছে, মানবিক চিকিৎসাব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে- সেই গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে।

ইরান আজ এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে জন্ম নেওয়া প্রায় প্রতিটি শিশুকে উন্নত পারমাণবিকভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বংশগত বিপাকীয় রোগের স্ক্রিনিং করা হয়। এই উদ্যোগ শুধু চিকিৎসা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রতিবন্ধকতা ও অকালমৃত্যু থেকে রক্ষার এক সুদূরপ্রসারী জাতীয় পরিকল্পনা।

ইরানের হাসপাতালগুলোতে এখন নবজাতকের জন্মের তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিনের মধ্যেই গোড়ালি থেকে সামান্য রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। অত্যাধুনিক ট্যান্ডেম ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি বা এমএস/এমএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ৫৮ ধরনের জটিল বংশগত বিপাকীয় রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

যে রোগগুলো জন্মের সময় বোঝা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে শিশুর মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র কিংবা শারীরিক বিকাশকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, সেগুলোই খুব দ্রুত ধরা পড়ে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।

ইরানের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই নীরব বিপ্লবের পেছনে রয়েছে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও গবেষণানির্ভর পারমাণবিক প্রযুক্তি। বহু বছর আগে মাত্র তিনটি রোগ শনাক্তের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল নবজাতক স্ক্রিনিং কর্মসূচি। ধীরে ধীরে তাতে যুক্ত হয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিডজনিত রোগ, ফ্যাটি অ্যাসিড অক্সিডেশন ত্রুটি, ইউরিয়া সাইকেলের জটিলতা এবং আরও বহু বিরল বিপাকীয় সমস্যা। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বিস্তৃত নবজাতক স্ক্রিনিং কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।

ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তি যুদ্ধের জন্য নয়, বরং মানবকল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত রেডিওআইসোটোপ উৎপাদনে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে মলিবডেনাম-৯৯ ও টেকনেশিয়াম-৯৯এম-এর মতো উপাদান তৈরি হচ্ছে গবেষণা রিঅ্যাক্টরে, যা আধুনিক রোগ নির্ণয়ে অপরিহার্য। নবজাতকের স্ক্রিনিং যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন ও নির্ভুল পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানি বিজ্ঞানীরা থেমে থাকেননি। তারা দেশীয় প্রযুক্তিতে স্ক্রিনিং কিট ও ডায়াগনস্টিক উপকরণ তৈরি করেছেন। ফলে বাইরের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং স্বাস্থ্যসেবায় আত্মনির্ভরতা বেড়েছে। এই সক্ষমতা এখন শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশটি অন্য রাষ্ট্রকেও চিকিৎসা সহায়তা দিতে শুরু করেছে। কিউবার কাছে উন্নত স্ক্রিনিং কিট উপহার দেওয়ার ঘটনাকে অনেকেই চিকিৎসা কূটনীতির নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

ইরানে এই স্ক্রিনিং এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো দেশটিতে বংশগত বিপাকীয় রোগের হার তুলনামূলক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে প্রায় একজন এসব রোগে আক্রান্ত হয়। বিশ্ব গড়ের তুলনায় এই হার অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক জিনগত বৈশিষ্ট্য ও আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের প্রবণতার কারণেও এই ঝুঁকি বেড়েছে।

ফেনাইলকিটোনিউরিয়া নামের একটি রোগের কথাই ধরা যাক। এই রোগে আক্রান্ত শিশুর শরীর ফেনাইলঅ্যালানিন নামের উপাদান ভাঙতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ক্ষতি শুরু হয়। জন্মের সময় শিশুকে স্বাভাবিক মনে হলেও কয়েক মাসের মধ্যে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধকতা, খিঁচুনি ও আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু জন্মের পরপরই রোগটি ধরা পড়লে শুধু খাদ্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই শিশুকে প্রায় স্বাভাবিক জীবন দেওয়া সম্ভব।

ইরানের চিকিৎসাব্যবস্থা এখানেই থেমে নেই। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর আক্রান্ত শিশুকে বিশেষায়িত বিপাকীয় ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, নার্স ও মনোবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত দল দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পরামর্শ দেয়। বিশেষ খাদ্য, ওষুধ, ভিটামিন থেরাপি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।

দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে শতভাগ স্ক্রিনিং নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু ফার্স প্রদেশেই বছরে প্রায় ৫৪ হাজার নবজাতকের পরীক্ষা করা হয়। টানা কয়েক বছর ধরে সেখানে শতভাগ কভারেজ বজায় রয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই মডেলকে জাতীয় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন