জাতীয় সংসদে দীর্ঘ প্রায় ৩৪ মিনিটের টানা বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, সংবিধান বিতর্ক, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতি- সব মিলিয়ে বিস্তৃত আলোচনা তুলে ধরেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার শুরুতেই দেওয়া এ বক্তব্যে তিনি সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন এবং বিকল্প রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শুরুতেই রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ তিনি শোনেননি বা পড়েননি এবং বিরোধী পক্ষ হিসেবে তারা সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবনে থাকার নৈতিক অধিকার নেই এবং তাকে অপসারণ করা উচিত। রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ‘কুকীর্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার কর্মকাণ্ড দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য প্রশ্নবিদ্ধ।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে তার কিছু বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, যার মধ্যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠা এবং কিছু দলকে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। এসব কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে নাহিদ বলেন, তখন দেশের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল- জাতীয় সরকার গঠন অথবা সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। তাদের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিএনপি তা গ্রহণ করেনি বলে দাবি করেন তিনি। দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে ব্যাখ্যা দেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
অর্থনৈতিক খাত নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থমন্ত্রী বারবার দাবি করছেন যে বিএনপি আমলে আর্থিক খাতে কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিয়োগকে রাজনৈতিক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণ পুনঃতফসিলের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
টিআইবির প্রতিবেদন উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ ঋণগ্রস্ত এবং তাদের অনেকেই নির্বাচনের আগে ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। এর ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবিধান প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, ওই সংবিধান প্রকৃত অর্থে স্বাধীন দেশের প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত হয়নি এবং এতে গণতান্ত্রিক ঘাটতি রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীরাও এর সমালোচনা করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান পুনর্লিখনের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হচ্ছে না। বিএনপি তাদের পূর্ব অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, যদি এই অবস্থান পরিবর্তন না হয়, তবে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গেও সমালোচনামূলক অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, জাতীয় সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যুক্ত করে ঐকমত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণের অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলা হয়েছে, যা জনমতের প্রতি অসম্মানজনক।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অতীত সরকারের নিয়োগ দেওয়া অনেক বিচারক এখনো বহাল থাকায় বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইন বাতিলের পর নতুন আইন প্রণয়নে বিলম্ব হওয়ায় সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্ক নিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ দেশের ভিত্তি, আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই চেতনার নবায়ন। এ দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই, বরং পরস্পরের পরিপূরক।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রয়োজন হলেও তা মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে হতে হবে। একতরফাভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সম্প্রতি হত্যা, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়েছে, কিন্তু সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু হামলার ঘটনায় এখনো মামলা গ্রহণ করা হয়নি, যা বিচারপ্রাপ্তির পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থানকে অস্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের নিরাপত্তা ইস্যু মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন এবং একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদে সরকারি দলের আচরণ এবং সংবিধান সংস্কার ও গণভোট ইস্যুতে তাদের অবস্থান তাকে হতাশ করেছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সব পক্ষই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।