বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত “তিন দিন অনলাইন, তিন দিন অফলাইন” পাঠদানের কৌশল নতুন করে শিক্ষাব্যবস্থাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। নীতিগতভাবে এটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও বাস্তবতার বিচার ও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক অনীহা ও সংশয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অনীহার পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কাঠামোগত, সামাজিক ও মানসিক কারণ।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় বাস্তবতা হলো ডিজিটাল বৈষম্য। শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান এখনো সুস্পষ্ট। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার নেই। আবার অনেক পরিবারে একটি ডিভাইস একাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ভাগাভাগি করতে হয়। ফলে অনলাইন ক্লাস তাদের জন্য কার্যত অংশগ্রহণের বাইরে থাকার সমান হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া মানসম্মত ডিভাইস ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগের অভাব অনলাইন শিক্ষাকে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করতে ব্যর্থ করছে। অভিভাবকদের মতে, সবার হাতে ভালো ডিভাইস নেই, যা এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ।
অনলাইন শিক্ষাকে অনেক সময় কম খরচের বিকল্প হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। ইন্টারনেট ডাটা খরচের সঙ্গে স্মার্টফোন বা ডিভাইস কেনার ব্যয় যোগ হতে পারে। আবার অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের সময় একজন শিক্ষার্থীকে রুমে বসে ফ্যান ও বাতির আলোয় ক্লাসে অংশ নিতে হয়, যার ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে পারে বহুগুণ। যা শ্রেণীকক্ষের একটি-দুইটি ফ্যান বা লাইটের চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ করবে। এছাড়াও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এসব ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, অফলাইন ক্লাসের তুলনায় অনলাইন ক্লাসে ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
করোনা মহামারির সময় চালু হওয়া অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা এখনো মানুষের মনে তাজা। সংশ্লিষ্টদের অধিকাংশের মতামত, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার মান সন্তোষজনক ছিল না। কারণ অনলাইন ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী যতটা পাঠ বোঝেন, তার চেয়ে অফলাইনে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। এখানেই তৈরি হয় ঘাটতি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের অভাব ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতার মতো বিষয়গুলোও এখানে বড় প্রভাবক। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, অনলাইন ক্লাস পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি করে এবং শেখার ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটায়।
এসবের সঙ্গে অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্বেগ, সেটি হলো ডিজিটাল আসক্তি। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার চেয়ে গেম ও সামাজিক মাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করে। এতে করে মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া, পড়া ঠিকঠাক না বোঝার মতো বিষয়গুলো ঘটে। ক্লাসের সময় অনেকেই ক্যামেরা বন্ধ রেখে অন্যকিছুতে মনোনিবেশ করে, যার ফলে পড়াশোনার শৃঙ্খলা ভেঙে যায়। অনেক অভিভাবক একে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।
অনলাইন শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকার ফলে চোখের সমস্যা, মানসিক চাপ ও একাকিত্ব বাড়তে পারে। দেখা দিতে পারে সামাজিক দক্ষতার অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা কেবল বইভিত্তিক জ্ঞান নয়। এটি সামাজিকতা, মূল্যবোধ ও মানসিক বিকাশের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যা ভার্চুয়াল মাধ্যমে পুরোপুরি অর্জন করা কঠিন।
অনলাইন শিক্ষা সফল করতে হলে প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, উপযোগী কনটেন্ট ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিক্ষক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন এবং অনলাইন কনটেন্টগুলোও শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে ওঠেনি এখনো। অনলাইনে শ্রেণিকক্ষের মতো ইন্টারঅ্যাকটিভ পরিবেশ তৈরি করা যায় না। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই অনলাইন শিক্ষা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অনলাইন শিক্ষা চালু হলে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা সুবিধা পেলেও গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। ডিজিটাল অ্যাক্সেসের ওপর নির্ভরশীলতা শিক্ষা বৈষম্য বাড়াবে। ফলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।
বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও অংশীজন অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে বিকল্প সমাধান প্রস্তাব করেছেন, যেমন ক্লাসের সময় কমানো, দিনের আলোতে পাঠদান, সাপ্তাহিক ছুটির পুনর্বিন্যাস ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন। এসব প্রস্তাব ইঙ্গিত করে যে, সমস্যার সমাধান হিসেবে অনলাইন শিক্ষা একমাত্র পথ নয়।
বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষা একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণযোগ্য হলেও মূলধারার বিকল্প হিসেবে তা এখনো প্রস্তুত নয়- এটাই বর্তমান বাস্তবতা। জ্বালানি সংকটের মতো সাময়িক সমস্যার সমাধানে এটি একটি নীতিগত উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। অতএব, অনলাইন শিক্ষার প্রতি অনীহা কোনো অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি বাস্তবমুখী উদ্বেগের প্রতিফলন। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনবান্ধব কনটেন্ট, সর্বোপরি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণ।