Ridge Bangla

সম্ভ্রম রক্ষার ওড়নাই যখন মৃত্যু ফাঁদ

গত ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর পোস্তগোলায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে পিংকি খাতুন (৩২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গেন্ডারিয়ায় ভাইয়ের বাসা থেকে দাওয়াত খেয়ে ফতুল্লায় নিজ বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি। পোস্তগোলা ব্রিজের নিচে এই দুর্ঘটনায় শিকার হওয়ার সময় তার দুই সন্তান ওই রিকশাতেই ছিল।

পিংকির এই মৃত্যু আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে এমন এক বিষয় যা নিয়ে আমাদের সমাজে তেমন আলোচনা হয় না বললেই চলে। আর সেটি হলো যাত্রাপথে নারীদের এভাবে ওড়না বা চাঁদরে পেঁচিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া। বাংলাদেশে মেয়েদের মধ্যে ওড়না পরার চল আছে ব্যাপকভাবে। সেই সঙ্গে নারীদের মধ্যে আছে চাদর ব্যবহারের প্রবণতা। কিন্তু গাড়িতে উঠে সেসব ঠিকভাবে সামলে না রাখার ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা।

অসাবধানতাবশত নারীদের এই সম্ভ্রম রক্ষার ওড়নাই ডেকে আনছে বিপদ, ঘটাচ্ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। যার সর্বশেষ উদাহরণ পিংকির মৃত্যু। তবে নারীদের এই ওড়নায় পেঁচিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে রিকশার সাথে ওড়নার একপ্রকার সখ্য দেখা যায়। কারণ যাত্রাপথে নারীরা ওড়না বা চাঁদরে পেঁচিয়ে যেসব দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, সেসবের বেশিরভাগই রিকশার সাথে সম্পর্কিত। বিভিন্ন সময়ে উঠে আসছে এমনই সব খবর, যেখানে রিকশায় করে যাওয়ার পথে চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন নারীরা।

রিকশার চাকার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে হওয়া দুর্ঘটনায় শুধু পিংকি নয়, গত ৬ এপ্রিল রাজবাড়ীতে নিহত হয়েছেন সেলিনা মোজাম্মেল ঝরনা (৬৬) নামের এক বৃদ্ধা। এই বছরের ১লা ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় এভাবেই রিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে সুমাইয়া খাতুন নামে এক কলেজছাত্রীর মৃত্যু হয়।

আমাদের সামনে এই ধরনের ঘটনাগুলো এখন আর কালেভদ্রে আসছে না। বরং প্রতিনিয়তই সংবাদের পাতা ওল্টালে দেখা যাচ্ছে এমন অনেক ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় নারীরা যেমন প্রাণ হারাচ্ছেন, তেমনি বরণ করছেন পঙ্গুত্ব। পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপির তথ্যে উঠে এসেছে, ওড়না, চাদর বা শাড়ির আঁচল সামলে না রাখার কারণে নিয়মিত ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছেন বহু নারী। এখন প্রায় নিয়মিত বিরতিতে এই ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হওয়া রোগী পাচ্ছে সিআরপি। তারা বলছে, রোগীর সংখ্যা কম নয়, তাদের মধ্যে মৃত্যুও হচ্ছে একটি বড় অংশের।

দুর্ঘটনায় শিকার নারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা শুরু করেছে সিআরপি। তাদের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতি বছর চারশোর অধিক নারী এই ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সেবা নিতে আসছেন। প্রতিবেদনটির একাংশে উঠে আসে কেবল সিআরপির সাভার শাখায় ওই বছর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য ৪৬ জন নারী ভর্তি হন। তাদের মধ্যে তখন তিনজন মারা যান বলে নিশ্চিত করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা জাহিদ উদ্দিন আকন্দ।

এরও এক বছর আগে, ২০১৭ সালে, সিআরপির তথ্য অনুযায়ী, সে বছর ইজিবাইকে ওড়না পেঁচিয়ে ৩৬ জন নারী মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় এমন দুর্ঘটনার হার সর্বাপেক্ষা বেশি। দুর্ঘটনায় শিকার বেশিরভাগ নারীর বয়স ২০ বছরের নিচে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুর্ঘটনার শিকার ২৩ জন নারীর বয়স ২০ বছরের নিচে এবং ১৩ জনের বয়স ২০ এর ওপরে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। রিকশায় চড়ে ওড়না পেঁচিয়ে নারীদের এমন মৃত্যু বা শারীরিক ক্ষমতা হারানো কখনোই কাম্য নয়। এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নারীর মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়, তবুও নারীরা এ সম্পর্কে অসচেতন।

এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নারীদের সচেতন হতে হবে। নইলে এ থেকে উদ্ধারের অন্য কোনো পথ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত যানবাহনের কাঠামোগত ত্রুটি এবং অসচেতনতাই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। রিকশা বা ইজিবাইকের ডিজাইন এমন যে, অনেক সময় চলন্ত অবস্থায় গাড়ির চাকার বা মোটরের ঘূর্ণায়মান অংশে ওড়নার ঝুলে থাকা অংশ মুহূর্তের মধ্যে পেঁচিয়ে যায়। ফলে যাত্রী তীব্র টান অনুভব করেন এবং সাথে সাথে তার গলায় ওড়নাটি ফাঁস হিসেবে কাজ করে।

এটি কেবল শারীরিক আঘাত নয়, বরং মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়া বা শ্বাসরোধের মতো মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ইজিবাইকের ইঞ্জিনের নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব এই বিপদকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক রিকশায় চাকার চারপাশে যথাযথ নিরাপত্তা গার্ড বা কাভার থাকে না, যা ওড়না বা কাপড়কে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়।

ওড়না নিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। সিআরপি বা ট্রমা বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন যা জীবন বাঁচাতে কার্যকর হতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে, খোলা যানবাহনে চলাচলের সময় ওড়না পেছনে ঝুলিয়ে না রেখে সামনে কোলের ওপর গুটিয়ে রাখা জরুরি। ওড়না বা শাড়ি পরা অবস্থায় রিকশা বা অটোরিকশার চালকের পাশে বা চাকাকে কেন্দ্র করে বসলে কাপড়টি ভালোভাবে সামলে বসতে হবে। প্রয়োজনে ওড়না ঘাড়ের কাছে সেফটিপিন দিয়ে আটকে নিতে পারেন। কোনো নারী ওড়না নিয়ে তিন চাকার যান ব্যবহারের সময় অসাবধান থাকলে তাকে বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়াও হতে পারে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।

সবশেষে, কেবল ওড়না বা পোশাকের ওপর দোষ চাপালেই চলবে না। গণপরিবহন বা থ্রি-হুইলারগুলোর নকশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও আধুনিকায়ন আনা জরুরি। পাশাপাশি চালকদেরকেও রাস্তার মাঝখানে তাড়াহুড়ো করে যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধ করতে হবে। নারীর ওড়না সামলানোর যে দায়বদ্ধতা, তা যেন পোশাকের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেদিকেও আমাদের নজর দিতে হবে।

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন