Ridge Bangla

ক্রিকেট বিশ্বের অলিখিত সম্রাট: আইসিসিতে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের নেপথ্যে

​একসময় ক্রিকেট ছিল কেবলই ‘জেন্টলম্যানস গেম’। সেসময়ে খেলাটির কেন্দ্রবিন্দু ছিল লর্ডস। কিন্তু গত তিন দশকে ক্রিকেটের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র লর্ডস থেকে সরে এসেছে। নতুন করে থিতু হয়েছে আরব সাগরের তীরে, মুম্বাইয়ে। আধুনিক ক্রিকেটে একটি কথা প্রচলিত আছে, আইসিসি ক্রিকেট চালায় ঠিকই, কিন্তু আইসিসি চলে ভারতের ইশারায়। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ভারতের এই প্রশ্নাতীত প্রভাবের নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু বিষয়ের সংমিশ্রণ।

​অর্থনীতির মহাশক্তি: ৮০ শতাংশের রাজত্ব

​আইসিসিতে ভারতের প্রভাবের মূল চালিকাশক্তি হলো অর্থ। ক্রিকেট দুনিয়ায় একটি ওপেন সিক্রেট হলো- আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আসে ভারতীয় বাজার থেকে। সম্প্রচার স্বত্ব বা ব্রডকাস্টিং রাইটস বিক্রির মাধ্যমেই আইসিসি সবথেকে বেশি আয় করে।

২০২৪-২০২৭ চক্রের জন্য আইসিসি শুধুমাত্র ভারতীয় বাজারের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে। আইসিসির যেকোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে যখন ভারতের ম্যাচ থাকে, তখন বিজ্ঞাপনের হার অন্য সব ম্যাচের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। স্টারের মতো বড় সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলো আইসিসিকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেয়, তার ভিত্তিই হলো ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের বাজার। স্বভাবতই, যে বাজার থেকে সিংহভাগ টাকা আসে, সেই বাজারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিসিসিআই-এর প্রভাব অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি থাকবে।

​নতুন রাজস্ব বণ্টন মডেল ও ভারতের একাধিপত্য

​সম্প্রতি আইসিসি ২০২৪-২০২৭ মেয়াদের জন্য যে নতুন রাজস্ব বণ্টন মডেল চূড়ান্ত করেছে, তা ভারতের একাধিপত্যকে কাগজে-কলমে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই মডেল অনুযায়ী, আইসিসির মোট আয়ের ৩৮.৫ শতাংশ একা পাবে ভারত। অঙ্কের হিসেবে যা বছরে প্রায় ২৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) পাবে মাত্র ৬.৮৯ শতাংশ এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) পাবে ৬.২৫ শতাংশ। বাকি ৯টি পূর্ণ সদস্য দেশ এবং সহযোগী দেশগুলোর ভাগ আরও নগণ্য। ভারত এই বিপুল অংশ দাবি করার পেছনে যুক্তি দেখায় যে, তারাই আইসিসির তহবিলের মূল জোগানদাতা। এই বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবধানই ভারতকে আইসিসির যেকোনো সিদ্ধান্তে ‘ভেটো’ দেওয়ার বা নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।

​আইপিএল: বিশ্ব ক্রিকেটের অপ্রতিরোধ্য মেগা টুর্নামেন্ট

​ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) কেবল একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট নয়, এটি একটি গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারহাউস। আইপিএলের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার কারণে আইসিসি এখন তাদের উইন্ডো বা সূচি এমনভাবে তৈরি করে যাতে আইপিএলের সময় অন্য কোনো বড় আন্তর্জাতিক সিরিজ না থাকে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা আইপিএলে খেলেন এবং এখান থেকে তারা যে পরিমাণ অর্থ আয় করেন, তা তাদের নিজেদের বোর্ড থেকে পাওয়া বার্ষিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি। ফলে বিদেশি ক্রিকেট বোর্ডগুলোও চাইলেও এখন আর ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে না। ক্রিকেটারদের স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক প্রবাহ সচল রাখতে আইপিএল ও বিসিসিআই-এর সাথে সুসম্পর্ক রাখা এখন প্রতিটি দেশের জন্যই অলিখিতভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​কূটনৈতিক প্রভাব ও নেতৃত্ব

​অর্থের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের নিয়ন্ত্রণ ঈর্ষণীয়। বিসিসিআই-এর সচিব জয় শাহ যখন আইসিসির চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন সেটি কেবল একটি নিয়োগ ছিল না, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একক রাজত্বের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, জগমোহন ডালমিয়ার সময় থেকেই ভারত আইসিসিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করে। এশিয়ান ব্লক বা এশীয় দেশগুলোর (পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ) সমর্থন আদায়ে ভারত সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের মতো ঐতিহ্যবাহী শক্তিশালী বোর্ডগুলোও ভারতের সাথে ‘বিগ থ্রি’ জোট গঠন করে ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।

​বিপণন এবং স্পনসরশিপের আধিপত্য

​আইসিসির অফিসিয়াল স্পনসরদের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ কোম্পানিই হয় ভারতীয় অথবা ভারতের বাজার লক্ষ্য করে কাজ করে। জোমাটো, এমআরএফ, বাইজুস বা ইন্ডিয়া সিমেন্টের মতো বড় কোম্পানিগুলো ক্রিকেটে যে বিনিয়োগ করে, তা সরাসরি আইসিসির তহবিলে প্রভাব ফেলে। যখন কোনো বহুজাতিক কোম্পানি আইসিসির সাথে চুক্তি করে, তারা প্রথমেই দেখে ভারতের কয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় আইসিসি বাধ্য হয়েই ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

​অবকাঠামো এবং মেগা ইভেন্ট

​আইসিসির মেগা ইভেন্টগুলো আয়োজনের ক্ষেত্রেও ভারতের প্রভাব লক্ষণীয়। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ যেভাবে এককভাবে ভারতে আয়োজিত হয়েছে এবং টুর্নামেন্ট থেকে যে রেকর্ড পরিমাণ লভ্যাংশ অর্জিত হয়েছে, তা আইসিসিকে ভারতের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে। ভারতের অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম এবং দর্শকদের উন্মাদনা যেকোনো টুর্নামেন্টের ব্যবসায়িক সফলতার গ্যারান্টি দেয়। এমনকি অন্য দেশে টুর্নামেন্ট হলেও সূচি এমনভাবে সাজানো হয় যাতে ভারতীয় দর্শকরা তাদের সুবিধাজনক ম্যাচ দেখতে পারেন।

​আইসিসিতে ভারতের এই প্রভাব নিছক ভাগ্য নয়, বরং গত তিন দশকের পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং বাজার ধরার ফসল। তবে এই আধিপত্য নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে বিতর্কও কম নয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের বিশ্বায়নের পথে বাধা হতে পারে। সহযোগী দেশগুলো বা তুলনামূলক দুর্বল বোর্ডগুলোর উন্নয়ন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দিনশেষে বাস্তবতা হলো, ক্রিকেট এখন একটি বিশাল শিল্প, আর ভারত সেই শিল্পের প্রধান জোগানদাতা। যতক্ষণ পর্যন্ত ভারতীয় বাজারের বিকল্প তৈরি না হচ্ছে, ততক্ষণ আইসিসিতে ভারতের এই আধিপত্য কেবল অটুটই থাকবে না, বরং সময়ের সাথে আরও শক্তিশালী হবে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন