Ridge Bangla

প্রাচীন মিশরীয়দের পরলোকবিশ্বাস

প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতিতে মৃত্যুর পরের জীবন ছিল একটি মৌলিক বিশ্বাস, যা সময়ের সঙ্গে কিছুটা রূপান্তরিত হলেও মূল চেতনায় ছিল এক অভিন্ন ধারা। অঞ্চলভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও মিশরীয়দের পরলোকচিন্তা মূলত যুক্ত ছিল দেবতা ওসাইরিসের মৃত্যু ও পুনর্জীবনের পৌরাণিক কাহিনি এবং তার জন্য নির্মিত অধোবিশ্ব ‘দুয়াত’ নিয়ে।

প্রথমদিকে পরলোকে প্রবেশাধিকার কেবল রাজপরিবারের সদস্যদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষও এর আওতায় এসে যায়। যদি তারা একটিমাত্র কবর এবং প্রয়োজনীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারত, তবে তারা সেই অনন্ত জীবনের দাবি করতে পারত।

অনেকের ধারণা, মিশরীয়রা মৃত্যুর প্রতি ছিল গভীরভাবে আকৃষ্ট। এটি মূলত অসংখ্য সমাধি, কবরে রাখা দ্রব্য, ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-সংক্রান্ত পুঁথির প্রাচুর্য দেখে গড়ে ওঠা ভ্রান্ত ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, মিশরীয়রা ছিল জীবনের পূজারি। তারা চেয়েছিল জীবন কখনোই শেষ না হোক।

মৃত্যুর দেবতা ও আত্মার যাত্রাপথ

ওসাইরিস ছিলেন মৃত্যু ও পরলোকের প্রধান দেবতা। আইসিস ও নেফথিস ছিলেন শোকপ্রকাশের দেবী। দেবতা আনুবিস মৃতের আত্মাকে দুয়াতের পথে পরিচালিত করতেন। যখন কোনো মানুষ বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করত, তখন আনুবিস কন্যা ক্বেবহেত মৃতকে সান্ত্বনা দিতেন।

আত্মা, দেহ ও মৃত্যুর পরবর্তী প্রস্তুতি

মিশরীয়দের মতে, মৃত্যুর পর আত্মা বিভিন্ন উপাদানে বিভক্ত হয়ে যায়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কা, বা, এবং এই দুয়ের মিলিত রূপ আখ।

কা ছিল জীবনীশক্তি, যা সৃষ্টি হয়েছিল আদিম বিশৃঙ্খল শক্তি থেকে, যার মাধ্যমে জগৎ সৃষ্টি হয়। বা ছিল ব্যক্তিত্ব বা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, অনেক সময় পাখির দেহে মানুষের মাথা বিশিষ্ট রূপে কল্পনা করা হতো। মৃত্যুর পরে কা ও বা একত্র হয়ে তৈরি করত আখ, যা হয়ে উঠত এক প্রেতসত্তা। এটি জীবিতদের সাহায্য বা বিপদে ফেলতে পারত। এই আত্মার যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য মৃতদেহ সংরক্ষণ করাই ছিল অন্যতম প্রধান রীতি। মমি বানানো হতো, যেন খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের জন্য আত্মা আবার সেই দেহে ফিরে আসতে পারে।

আত্মার উপাদান

প্রাচীন মিশরীয় দর্শনে আত্মা একক কোন সত্তা নয়। তা গঠিত ছিল বহুস্তর বিশিষ্ট উপাদানে। বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে আত্মার উপাদান পাঁচ, সাত কিংবা সাধারণত নয়টি পর্যন্ত বিবৃত হয়েছে। প্রতিটি উপাদান জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পর একেকটি বিশেষ ভূমিকা পালন করত।

মৃতদেহকে বলা হতো খাত। আত্মার অন্যান্য অংশগুলো খাতকে চিনে তাদের যাত্রাপথ শুরু করত। মৃতের জন্য কবরস্থানে রেখে যাওয়া খাদ্য ও পানীয় এই দেহের মধ্য দিয়েই আত্মাকে জাদুময়ভাবে পুষ্ট করত। সাহু ছিল ঐ দেহের অতিলৌকিক প্রতিরূপ, যা জীবিতদের জগতে আবির্ভূত হতে পারত। সাহু কখনো স্বপ্নে, কখনো প্রতিশোধপরায়ণ আত্মা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত।

রেন বা নাম হলো প্রতিটি ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য নির্দেশকারী উপাদান। কারও নাম মুছে ফেলা মানে তাকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়া।

কা আত্মার সমতুল্য। মৃত্যুর পর যখন কা শরীর ত্যাগ করে, তখনই ব্যক্তিকে প্রকৃত অর্থে মৃত বলে গণ্য করা হত। কা-ই নৈবেদ্য গ্রহণ করত এবং জীবনীশক্তি হিসেবে টিকে থাকত।

শুয়েত বা ছায়া মৃত্যুর পরও তা আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হত। বুক অভ দ্য ডেড গ্রন্থে শুয়েতকে আত্মার রক্ষাকবচ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবশেষে হলো আব বা হৃদয়। হৃদয় পরিমাপ কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠানেই আব-এর বিচার হত। জীবনের সমস্ত কর্ম-অকর্ম এর মধ্যে লিপিবদ্ধ থাকত।

দোয়াতের বিন্যাস

মৃত্যুর পর, আত্মার যাত্রা শুরু হত খাত সংরক্ষণের মাধ্যমে। কা ও বা যেন খাতকে চিনে আখ রূপে রূপান্তরিত হতে পারে, সে জন্য প্রয়োজন ছিল নিখুঁত দেহ সংরক্ষণ ও মুখ খোলার অনুষ্ঠান। এই আচার সমাপ্তির পর কবরের দরজা বন্ধ করে দেয়া হতো। শুরু হতো শোকানুষ্ঠান ও ভোজ। তখনই দেবতা আনুবিস এসে মৃতকে নিয়ে যেত পরলোকে।

মিশরীয় পরকালীন জগতের চিত্র পাওয়া যায় নিউ কিংডম যুগের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপিগুলিতে, বিশেষ করে আমদোয়াত ও বুক অব গেটসে।

বুক অভ গেটসে বর্ণিত হয়েছে বারোটি দ্বারের কথা। প্রতিটিতে আছে একাধিক প্রহরী, যাদের পেরিয়ে আত্মাকে পৌঁছাতে হয় আ’আরু অর্থাৎ অনন্ত বসন্তের শস্যভূমিতে। তবে সব কিছুর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ফিল্ডস অব রিডস বা ঈশ্বরের ভূমিতে পৌঁছানো। এই জগতে ছিল না রোগ, ছিল না অনাবৃষ্টি কিংবা দুঃখ। ছিল কেবল এক অনন্ত বসন্ত।

চূড়ান্ত বিচারের আয়োজন ও হৃদয় পরিমাপের অনুষ্ঠান

প্রাচীন মিশরীয় পরলোকচিন্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চিত্রনির্ভর আচারগুলোর একটি হলো হৃদয় পরিমাপের অনুষ্ঠান। এটি অনুষ্ঠিত হতো ‘সত্যের সভা’ বা হল অব ট্রুথ-এ, যেখানে মৃত ব্যক্তির আত্মা প্রবেশ করত চূড়ান্ত বিচারের জন্য। বিচারকমণ্ডলীতে থাকতেন ওসাইরিস, সত্য ও ন্যায়ের দেবী মা’আত, জ্ঞান ও লিপির দেবতা থথ, মৃতের পথপ্রদর্শক আনুবিস, এবং আরও ৪২ জন বিচারক।

এই বিচার পর্বের শুরুতে মৃত ব্যক্তিকে নিজের পাপমুক্ত জীবনযাত্রার প্রমাণ দিতে হতো। এর অংশ হিসেবে উচ্চারণ করতে হতো ‘নেতিবাচক স্বীকারোক্তি’। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি তার নৈতিক পবিত্রতা প্রতিষ্ঠা করত। এরপর আসত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, হৃদয় পরিমাপের অনুষ্ঠান। মৃতের হৃদয় রাখা হতো ন্যায়ের পাল্লায়, অপর পাশে থাকত মা’আতের শুভ্র পালক। হৃদয় পালকের সমান হলে প্রমাণিত হতো, ব্যক্তি ন্যায়ের পথে চলেছে, এবং তাকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হতো পরম শান্তির স্বর্গরাজ্যে।

তবে হৃদয় যদি পালকের চেয়ে ভারী হতো তাহলে বুঝা যেত ব্যক্তি অন্যায় ও পাপে লিপ্ত ছিল। তাকে নিক্ষেপ করা হতো ভয়ংকর প্রাণী আম্মুতের সামনে। আম্মুত সেই হৃদয় গিলে ফেলত, আর মৃত ব্যক্তি চিরতরে বিলীন হয়ে যেত। প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে নরক বলে কিছু ছিল না। কারণ তাদের দৃষ্টিতে অস্তিত্বের বিলুপ্তিই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর শাস্তি।

মৃতদের গ্রন্থ’ ও মৃত্যুর পরের পথনির্দেশ

প্রাচীন মিশরের পরকালচর্চায় সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থ হলো মৃতদের গ্রন্থ বা বুক অভ দ্য ডেড। এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য ছিল হৃদয় পরিমাপ, আত্মার উত্থান, এবং ‘আরুর ক্ষেত্র’ নামক স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের নির্দেশিকা। মোট ১৯২টি মন্ত্র এতে বিদ্যমান।

প্রাচীন মিশরীয়দের দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি ছিল না। এটি ছিল আরেক জীবনের শুরু। এবং সেই জীবনের দিকে যাত্রাপথে প্রয়োজন ছিল আত্মার বিশুদ্ধতা, হৃদয়ের ভারসাম্য, সঠিক মন্ত্রপাঠ, ও দেবতাদের দয়া। এই চেতনাই তাদের শিল্প, ধর্ম এবং জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি গড়ে দেয়।

তথ্যসূত্র

১। Preparation for death in ancient Egypt – The Australian Museum

২। Journey to the afterlife | British Museum

৩। Ancient Egyptian religion – Afterlife, Gods, Rituals | Britannica

৪। Ancient Egyptian afterlife beliefs | EBSCO Research Starters

৫। Book of the Dead: A Guidebook to the Afterlife – ARCE

This post was viewed: 46

আরো পড়ুন