Ridge Bangla

প্রথম বল্কান যুদ্ধ: ইউরোপ থেকে উসমানীদের বিদায়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে সংঘটিত হয় প্রথম বল্কান যুদ্ধ। প্রথম যুদ্ধের স্থায়িত্ব ছিল ১৯১২ সালের মে থেকে পরের বছর অক্টোবর পর্যন্ত। বল্কান যুদ্ধের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের মানচিত্রে বিশাল বদল আসে, বৃদ্ধি পায় জাতিগত রেষারেষি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনেক কারণের মধ্যে বল্কানের অস্থিতিশীলতা অন্যতম।

সংঘাতের একদিকে বল্কান লীগ (Balkan League), যার সদস্য গ্রীস, সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো এবং বুলগেরিয়া; অন্যদিকে উসমানী সালতানাত। একসময়ের পরাক্রমশালী এই সাম্রাজ্য তখন ক্ষয়িষ্ণু। ইউরোপের রুগ্নব্যক্তি (Sick man of Europe) অভিধার অন্যতম দাবিদার তখন তারাই। প্রযুক্তির প্রয়োগে বিলম্ব এবং সময়মতো সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নের ব্যর্থতার মূল্য কড়ায়-গন্ডায় চুকাতে হয়েছিল সুলতানদের।

একটা সময় বল্কানের বিশাল অংশ ছিল উসমানীদের নিয়ন্ত্রণে। বিংশ শতকের প্রথমদিকে রাজনৈতিক জটিলতায় এই বল্কানই হয়ে উঠেছিল বারুদের পিপে, যুদ্ধের জন্য দরকার ছিল সামান্য একটু স্ফুলিঙ্গ।

প্রেক্ষাপট

উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকেই ইউরোপীয় অংশের ওপর উসমানীদের নিয়ন্ত্রণ প্রবলভাবে হ্রাস পায়, বল্কানে আরম্ভ হয় জাতীয়তাবাদের জোয়ার। সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সার্ব, গ্রীক আর বুলগেরিয়ানরা নিজ নিজ অঞ্চলের স্বাধীনতা দাবি করে।

মেসিডোনিয়ার খ্রিষ্টান জনগণ উসমানী শাসনের প্রতি বিরূপ ছিল। এদের মধ্যে গ্রীক, বুলগেরিয়ান, সার্বসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত। মেসিডোনিয়ার স্বাধীনতাকামী সংগঠন The Internal Macedonian Revolutionary Organization (IMRO) এই সময় শক্তি সঞ্চয় করে। উসমানী সেনাদের সাথে বেশ কিছু সংঘর্ষ হয় তাদের। সার্বিয়া তলে তলে মদদ দিতে থাকে স্বাধীনতাপন্থী মেসিডোনিয়ান সার্বদের। গ্রীসের লক্ষ্য ছিল পর্যায়ক্রমে মেসিডোনিয়া হয়ে ক্রিটের সাথে একীভূত হওয়া।

ওদিকে কন্সট্যান্টিনোপোলে চলছিল ক্ষমতার পালাবদল। ইয়াং তুর্ক (Young Turks) নামে সংস্কারপন্থী একটি দল ১৯০৮ সালে ক্ষমতা দখল করে। এদের লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যের সব এলাকাকে কেন্দ্রের শাসনে নিয়ে আসা। তাদের চাপে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (Abdul Hamid II ) সংবিধানের ওপর থেকে স্থগিতাদেশ উঠিয়ে নেন। ঘোষণা করা হয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ। উসমানী ইতিহাসে এই সময় পরিচিত দ্বিতীয় সাংবিধানিক যুগ হিসেবে, তবে এর স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র চার বছর।

কন্সট্যান্টিনোপোলে গোলযোগের সুযোগ নিয়ে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য বল্কানে উসমানী সাম্রাজ্যভুক্ত বসনিয়া-হার্জেগোভিনা (Bosnia-Herzegovina) দখল করে নেয়। তাদের প্ররোচনায় ১৯০৮ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বুলগেরিয়াও। তারাও মেসিডোনিয়ার প্রতি আগ্রহী।

বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে নিজেদের এলাকা মনে করতো সার্বিয়া, ফলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরির কাজে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় তারা। চলমান ঘটনাবলী উদ্বিগ্ন করে তোলে জার শাসিত রাশিয়াকেও। বল্কানে প্রভাব বিস্তারে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ানরা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের সামনে। এই পরিস্থিতিতে মিত্র সার্বিয়ার পাশে দাঁড়ায় তারা। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯১২ সালের শুরুতে বুলগেরিয়া আর সার্বিয়া পারস্পরিক সহযোগিতার গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরে এর অংশ হয় গ্রীস আর মন্টেনেগ্রো। জন্ম নেয় বল্কান লীগ, যার লক্ষ্য মেসিডোনিয়া উসমানীদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া। মেসিডোনিয়া নিয়ে প্রত্যেকের ছিল আলাদা পরিকল্পনা, ফলে এই জোট বেশিদিন টেকেনি।

দুর্বল উসমানী শক্তি

বল্কানে যখন গুটি চালাচালি চলছে, তখন উসমানীরা ব্যস্ত ইতালির সাথে সংঘাতে। ১৯১১-১২ পর্যন্ত স্থায়ী এই লড়াই তাদের সামরিক শক্তির জন্য ছিল বিপর্যয়কর। লিবিয়াসহ বেশ কিছু দ্বীপ দখল করে নেয় ইতালি। পর্যুদস্ত শত্রুকে আঘাত করার জন্য ঠিক এই সময়টাই বেছে নেয় বল্কান লীগ। এজন্য প্রায় সাড়ে সাত লাখ সেনা জড়ো করা হয়।

তৎকালীন পরাশক্তি-ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া আর অস্ট্রো-হাঙ্গেরির মতদ্বৈততার জন্য পরিস্থিতি আরো বিস্ফোরন্মুখ হয়ে ওঠে। অস্ট্রিয়ানরা মেসিডোনিয়া নিয়ে যেকোনো ধরনের সার্বিয়ান পরিকল্পনার বিরোধী, ওদিকে রাশিয়া আবার সার্বিয়াকে সমর্থন দিচ্ছিল। ফলে যুদ্ধ ছিল অবশ্যম্ভাবী।

সূচনা

১৯১২ সালের ৮ অক্টোবর উসমানীদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা করে মন্টেনিগ্রো। পার্শ্ববর্তী আলবেনিয়ার স্কুটারিতে (Scutari/Shkodër) উসমানী সেনাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ করে তারা। শহরের ওপর জারি হয় অবরোধ। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল স্কুটারি।

সংঘর্ষ

এরপর একে একে লীগের অন্য সদস্যরাও জড়িয়ে পড়ে লড়াইয়ে। সার্বিয়ানরা ঢুকে পড়ে মেসিডোনিয়াতে। কুমানোভোর যুদ্ধে ভেঙ্গে পড়ে উসমানীদের প্রতিরক্ষা। সার্বিয়ানরা ঝড়ের বেগে এগিয়ে যায় কসোভোর দিকে। ডিসেম্বর নাগাদ আলবেনিয়ার ভেতর দিকে আড্রিয়াটিক উপকূল অবধি অগ্রসর হয় সার্বিয়ান সেনারা। বিটোলা নগরী অধিকার করে তারা, এরপর কব্জা করে প্রিস্টিনা। এর ফলে মধ্যযুগীয় সার্বিয়া, বা ওল্ড সার্বিয়ার পুরোটাই উসমানীদের থেকে ফিরিয়ে নেয় তারা। এরপর মন্টেনেগ্রোর সেনাদের সাথে একত্রিত হয়ে মেসিডোনিয়ার প্রধান শহর স্কোপিয়া (Skopje) দখল করে সার্বরা।

বুলগেরিয়ানরাও বসে ছিল না। মিত্রদের মধ্যে সর্ববৃহৎ সেনা জমায়েত করেছিল তাঁরাই। পূর্ব থ্রেসে সীমিত ছিল তাদের অভিযান। আদ্রিয়ানোপোল (Adrianople/Edirne) অবরোধ করে বসে একদল, বাকিরা রওনা হয় কন্সট্যান্টিনোপোল বরাবর। পিছাতে পিছাতে চাতালজাতে (Battle of Çatalca) গিয়ে দম ফেলে উসমানীরা।

এখানেও হামলা করে বুলগেরিয় বাহিনী। চাতালজার পতন হলে উন্মুক্ত হয়ে যেত কন্সট্যান্টিনোপোল। ফলে তীব্র লড়াই হয়, শেষ পর্যন্ত পিছু হটে বুলগেরিয়রা। এরপর চাতালজার চারদিকে গর্ত খুঁড়ে বন্দুক বাগিয়ে অবস্থান নেয় দুই পক্ষ। ততদিনে আদ্রিয়ানোপোলের অবরোধে যোগ দিয়েছে সার্বরাও।

গ্রীকরা জলপথে আক্রমণ করে উসমানী নৌবাহিনীর ওপর, লক্ষ্য ছিল এশিয়া থেকে ইউরোপে যাতে সেনা আর সরঞ্জাম পাঠাতে না পারে তারা। ইজিয়ান সাগরে উসমানীদের অধীনস্থ সমস্ত দ্বীপ চলে যায় গ্রীকদের হাতে। এর মধ্যেই অভিযান শুরু করে স্থলসেনারা। নভেম্বর নাগাদ সালোনিকার পতন হয়, জ্যানাইনা নগরীতে জারি হয় অবরোধ।

মেসিডোনিয়ার এপাইরাসে তুমুল সঙ্ঘর্ষ হয় গ্রীক আর উসমানী সেনাবাহিনীর। প্রত্যেকবারেই পরাজিত হয় উসমানীরা। ৮ নভেম্বর থেসালোনিকিতে (Thessaloniki) প্রবেশ করে গ্রীক সেনারা।

লন্ডন সম্মেলন

বল্কানে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হোক সেটা কোনো পরাশক্তিই চায়নি। তড়িঘড়ি করে ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে আয়োজিত হয় লন্ডন সম্মেলন, উদ্দেশ্য উসমানীদের হারানো অঞ্চলের ভাগবাটোয়ারা। পরের কয়েক মাস ধরে অন্তত ৬৩টি সভার পর মোটামুটি একটা খসড়া দাঁড়া করান আলোচকরা।

তবে এর মধ্যেই দেখা দেয় নতুন সমস্যা। ১৯১৩ সালে কন্সট্যান্টিনোপোলে অভ্যুত্থান ঘটায় ইয়াং তুর্ক দল। সুলতানকে আড়াল করে সরকারের দায়িত্ব নেন মাহমুদ পাশা (Mahmud Şevket Pasha)। লন্ডন চুক্তিতে উসমানীদের স্বার্থরক্ষা হবে না এই দাবিতে সম্মেলন থেকে চলে যান তারা। নতুন করে আরম্ভ হয় লড়াই।

ইয়াং তুর্কদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল আদ্রিয়ানোপোল মুক্ত করা, কিন্তু উসমানীদের শক্তি তখন তলানিতে। ৬ মার্চ জ্যানাইনা দখল করে নেয় গ্রীকরা। ২৬ মার্চ বুলগেরিয়দের হাতে পতন হয় আদ্রিয়ানোপোলের।

ওদিকে স্কুটারি নিয়ে লন্ডনে শুরু হয়ে বাকবিতণ্ডা। অস্ট্রিয়ানদের বক্তব্য আলবেনিয়া নামে নতুন এক রাষ্ট্র গঠন করা হোক, স্কুটারি হবে তাদের অংশ। তাদের চাপে অবরোধকারী সার্বরা সরে যায়, থাকে কেবল মন্টেনিগ্রো। পরাশক্তিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ২২ এপ্রিল ঠিকই স্কুটারি অধিকার করে তারা। কিন্তু এরপরেই অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলে হাজির হয় পরাশক্তিদের নৌবহর, ৫ মে স্কুটারি পরিত্যাগ করে মন্টেনিগ্রোর সেনারা।

অবশেষে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হয় উসমানীরা। ১৯১৩ সালের মে’তে স্বাক্ষরিত হয় লন্ডন চুক্তি। সাম্রাজ্যের ইউরোপিয়ান অংশের প্রায় পুরোটাই ছেড়ে দিতে হয় উসমানী সালতানাতকে, যার মধ্যে ছিল মেসিডোনিয়া, এপাইরাস, কসোভো আর থ্রেস। বল্কান লীগ এগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। আদ্রিয়ানোপোল যায় বুলগেরিয়ার পাতে, থেসালোনিকি আর দক্ষিণ মেসিডোনিয়া গ্রীসের সাথে যুক্ত হয়।

শক্তিশালী সার্বিয়া অস্ট্রিয়ার কাম্য নয়। তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে তৈরি হয় স্বাধীন আলবেনিয়া। এর উদ্দেশ্য অ্যাড্রিয়াটিক উপকূল থেকে সার্বদের দূরে রাখা, এবং তাদের সীমানা সম্প্রসারণের রাশ টানা। ফলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরির প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে সার্বিয়া।

লন্ডন চুক্তি অনেককেই খুশি করতে পারেনি। বিশেষ করে নিজেদের প্রাপ্য নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না বুলগেরিয়া। ১৯১৩ সালে লীগের অন্য সদস্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা, আরম্ভ হয় দ্বিতীয় বল্কান যুদ্ধ।

ফলাফল

বল্কান যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ছিল অগণিত। বহু মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে পরিণত হয় উদ্বাস্তুতে। বৃদ্ধি পায় জাতিগত সহিংসতা। মূল সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলেছিল এই সংঘর্ষ। বল্কান লীগের বাইরেও পরাশক্তিগুলো এই অঞ্চলে ক্ষমতা বিস্তারে খাটাচ্ছিল নানান কূটকৌশল। এই সূত্রেই সারায়েভোতে উগ্র সার্ব জাতীয়তাবাদীদের হাতে খুন হন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী। পৃথিবী প্রত্যক্ষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।

References
  • Balkan Wars; Encyclopedia Britannica.
  • Hall, Richard C. The Balkan Wars, 1912–1913: Prelude to the First World War. Routledge, 2000.
  • Jelavich, Barbara. History of the Balkans: Twentieth Century. Cambridge University Press, 1983.
  • Pavlowitch, Stevan K. A History of the Balkans, 1804–1945. Longman, 1999.
  • Glenny, Misha. The Balkans: Nationalism, War, and the Great Powers, 1804–2012. Penguin, 2012.
  • Perry, Duncan M. The Politics of Terror: The Macedonian Liberation Movements, 1893–1903. Duke University Press, 1988.
This post was viewed: 35

আরো পড়ুন