বিশ্ব বাণিজ্যের প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত সমুদ্রপথ এখন আর কেবল অর্থনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা ক্রমেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, উত্তেজনা এবং শক্তি প্রদর্শনের নতুন মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। হরমুজ, মালাক্কা থেকে শুরু করে পানামা খাল পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলোকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে একধরনের নতুন বৈশ্বিক অস্থিরতা, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি মালাক্কা প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে টোল আরোপের একটি প্রস্তাব দেন ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া। প্রস্তাবটি সরাসরি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান থেকে অনুপ্রাণিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব থেকে সরে আসে, তবে এটি বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এলিজাবেথ ব্রাও পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব অস্থিরতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, “এতটা বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত সামুদ্রিক পরিবেশ আমরা আগে দেখিনি।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য দীর্ঘদিন নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য ছিল। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবাহিত হলেও সেই কাঠামো এখন বড় ধরনের চাপের মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পথ হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এবং ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালির নিরাপত্তা আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
ইরান একাধিকবার জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দর লক্ষ্য করে অবরোধ এবং তল্লাশি অভিযান জোরদার করেছে। এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি অবরোধ না থাকলেও ‘অনুমতি-নির্ভর’ চলাচল নিজেই বাণিজ্য খরচ ও অনিশ্চয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আমেরিকা মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পানামা খালও এখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ চীনের বিরুদ্ধে ‘লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ’ প্রয়োগ এবং পানামা-নিবন্ধিত জাহাজকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চীন বিভিন্ন বন্দরে পানামা-নিবন্ধিত জাহাজ আটক করেছে এবং এর মাধ্যমে সামুদ্রিক বাণিজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ভণ্ডামির অভিযোগ তুলেছে। এই ধরনের ঘটনা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে ক্রমশ রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপ প্রয়োগের কৌশলে রূপ দিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপথ এখন সরাসরি কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বিধিনিষেধ ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। একইভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হয়রানির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দস্যুতার ঘটনা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিপিং খাতে। নিরাপদ পথ এড়িয়ে দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে, একই সঙ্গে সময়ও লাগছে বেশি। বীমা প্রিমিয়াম এবং যুদ্ধঝুঁকি সংক্রান্ত অতিরিক্ত খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামান্য বিলম্ব বা তল্লাশিও এখন পুরো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে জাহাজের রুট নির্বাচন, পতাকা পরিবর্তন এবং বন্দর ব্যবহারের সিদ্ধান্তেও নতুন করে কৌশলগত হিসাব করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বিদ্যমান ‘নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা’ দুর্বল হয়ে ‘শক্তিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’য় রূপ নিতে পারে। এতে ছোট ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বাধীনতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক জ্যাক কেনেডি বলেন, “সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নজির তৈরি হওয়া। যখন দেশগুলো সীমা পরীক্ষা করতে শুরু করে, তখন বাণিজ্য নিয়মের ওপর নির্ভর করে না, বরং সেটা শক্তি ও দরকষাকষির ওপর নির্ভর করে।”
হরমুজ থেকে মালাক্কা এবং পানামা পর্যন্ত বিস্তৃত এই নৌপথগুলো এখন আর কেবল বাণিজ্যের করিডোর নয়। এগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বৈশ্বিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কৌশলগত চাপ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে।