ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা ১১ হাজারের বেশি নাবিককে সরিয়ে নিতে বড় পরিসরে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা।
সংস্থাটির মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গোয়েজ জানিয়েছেন, ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ওই অঞ্চলের উপকূলীয় দেশগুলো এবং সামুদ্রিক খাতের সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করেছি এবং এই উদ্ধার অভিযানকে সফল করতে নিরাপদ নৌচলাচলের পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেছি।’
সংঘাত বন্ধে গত সপ্তাহে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হলেও এর সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সমঝোতা স্মারকে এমন নিশ্চয়তা রয়েছে, যার মাধ্যমে ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবে।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরান সুদূর ভবিষ্যৎ (অনন্তকাল!!!) পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্তরের পরমাণু পরিদর্শনে পুরোপুরি সম্মত হয়েছে। এটি “পরমাণু সততা” নিশ্চিত করবে।’
তবে এর কিছুক্ষণ আগেই ইরান জানায়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হওয়া পরমাণু স্থাপনাগুলোতে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ সংস্থাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানিরা তাদের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশগুলোর ওপর আইএইএ-র জোরালো পরিদর্শনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানি প্রশাসন তাদের অভ্যন্তরীণ দর্শকদের শান্ত রাখতে নিজেদের মতো করে কথা বলবে।’
অন্যদিকে পাকিস্তান সফররত ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘ইরান আমাদের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা নিয়ে কোনো অবস্থাতেই, কারও সঙ্গে কখনো আলোচনা করবে না।’
পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি আলোচনার টেবিলেই ছিল না এবং সমঝোতা স্মারকেও এর কোনো উল্লেখ নেই।
এদিকে চুক্তি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলো সফর শুরু করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছানোর পর তাঁর কুয়েত ও বাহরাইন সফরের কথা রয়েছে। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
মঙ্গলবার আমিরাতে পৌঁছে রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশকে টোল বা কর আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না। ইরান এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে টোল নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
রুবিও বলেন, ‘এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশের টোল বা ফি নেওয়ার অনুমতি নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইন। আমার মনে হয় না এই অঞ্চলের কোনো দেশকে এ ব্যাপারে আমাদের বোঝাতে হবে, তারা আমাদের সঙ্গে একমত হবেন।’
আটকে থাকা নাবিকদের উদ্ধারের বিষয়টি অনেকটাই হরমুজ প্রণালি খোলা থাকার ওপর নির্ভর করছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার মহাসচিব ডোমিঙ্গোয়েজ বলেন, নাবিকদের সহায়তায় নেওয়া এই উদ্যোগ ‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার এবং বেসামরিক জাহাজের ওপর অগ্রহণযোগ্য হামলা বন্ধ করার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ’।
তিনি আরও বলেন, ‘হাজার হাজার নিরপরাধ নাবিকের কয়েক মাসের কষ্ট ও দুর্ভোগ এবং সমগ্র বিশ্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের পর, আমি গভীর সন্তোষের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানাই।’
ওমানের নৌ-কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা জানিয়েছে, উদ্ধার কার্যক্রমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দুটি অস্থায়ী পথ ব্যবহার করা হতে পারে। প্রতিটি জাহাজের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিদিন নিরাপদে বের হয়ে যাওয়া জাহাজের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে সংস্থাটি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু হওয়ার পর দেশটি কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়ে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুন চুক্তি হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৭২টি জাহাজ পুনরায় চালু হওয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। এর মধ্যে শনিবারই পার হয়েছে ৪২টি জাহাজ।
তবে সংঘাতের আগের তুলনায় এই সংখ্যা এখনো অনেক কম। আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৮টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত। বিবিসি ভেরিফাইয়ের জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মঙ্গলবারও প্রণালির ভেতরে ২০০টির বেশি তেলের ট্যাংকার অপেক্ষমাণ ছিল।