Ridge Bangla

সংসদে জুলাই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগমের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত জাবির ইব্রাহিমের মা ও জামায়াতের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেছেন, একজন বাবা-মায়ের কাছে সব সুযোগ-সুবিধার আগে সন্তানের হত্যার বিচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দৃশ্যমান বিচার ছাড়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন রোকেয়া বেগম।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের প্রধান দাবি হলো প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে সংসদে জানানোর দাবি জানান তিনি।

রোকেয়া বেগম বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবারের জন্য মাসিক ভাতা, আহত যোদ্ধাদের জন্য শ্রেণিভিত্তিক ভাতা এবং আবাসন সহায়তায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে শহীদ পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা বিচার নিশ্চিত করা।

তিনি জানান, গত ২১ জুন সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৮০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টির রায় হয়েছে, ২২টির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং ৫১টি মামলা তদন্তাধীন।

রোকেয়া বেগম বলেন, প্রায় ২ বছরে মাত্র ৭টি মামলার রায় হওয়া থেকেই বোঝা যায় বিচার কার্যক্রম কত ধীরগতিতে চলছে।

তিনি আরও বলেন, এসব মামলায় মোট আসামি ৪৬৩ জন। তাঁদের মধ্যে ১৭৪ জন গ্রেপ্তার হলেও এখনো ২৮৮ জন পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতি জানতে চান তিনি। একই সঙ্গে স্পিকারের মাধ্যমে আইনমন্ত্রীর কাছে প্রতিটি অধিবেশনে বিচার কার্যক্রমের সর্বশেষ তথ্য সংসদে তুলে ধরার দাবি জানান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্বীকৃতির বিষয়েও কথা বলেন রোকেয়া বেগম।

তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদের সংখ্যা হাজারেরও বেশি ছিল। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত করতে পেরেছি মাত্র ৮৩৪ জনকে। আরও ৫০ জন শহীদের নাম এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।’

সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বাকি শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানান তিনি।

আহত যোদ্ধাদের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘যে আন্দোলনে একজন যোদ্ধার হাত চলে গেছে, সে কীভাবে ‘গ’ ক্যাটাগরিতে থাকতে পারে?’

এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ৮৩৪ জন শহীদ ও ১৪ হাজার ৪০৭ জন আহত যোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়েছেন। এগুলো শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটির পেছনে একটি করে বিপর্যস্ত পরিবার রয়েছে।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ৮৩১টি শহীদ পরিবার ও ৬২৭ জন আহত যোদ্ধাকে ১২০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিবেদনে এর স্বচ্ছতা প্রমাণিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে গত ৩ মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীরা বেতন ও ঈদ বোনাস পাননি বলে জানান রোকেয়া বেগম।

সংসদে তিনি তিনটি দাবি তুলে ধরেন। এগুলো হলো- ফাউন্ডেশনের জন্য পৃথক আর্থিক কোডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের জন্য সরকারের প্রতিশ্রুত বাকি ২৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অথবা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফাউন্ডেশনটিকে আনুষ্ঠানিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবনে হুমকি, নির্যাতন এবং স্মৃতিস্তম্ভে হামলার অভিযোগও করেন রোকেয়া বেগম।

তিনি বলেন, ‘জুলাইকে মুছে ফেলতে পলাতক ফ্যাসিস্টের বাহিনী বাস্তবে ও সামাজিক মাধ্যমে অতিমাত্রায় তৎপর।’

এ কারণে জুলাই যোদ্ধাদের রাজনৈতিক সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর অবস্থান জানতে চান তিনি।

নিজের ছেলে জাবির ইব্রাহিমকে স্মরণ করে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার ছোট্ট জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। আমি যখন ওকে দেখছিলাম, তখন দেখছিলাম ও সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। একটা ফোঁটা রক্তও ওর ভেতরে ছিল না। পুরো রক্ত এই জমিনে পড়ে গিয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলের মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত ও বীর সন্তানের অঙ্গহানির আর্তনাদে ভাসছে এই জাতীয় সংসদ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর নানা জুলুম-নির্যাতনের পর এই রক্তস্নাত জাতীয় সংসদে আবার বাজেট আলোচনা চলছে। জুলাই না এলে এটা সম্ভব হতো না।’

রোকেয়া বেগমের বক্তব্যের পর সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘যিনি শহীদ মাতা বক্তৃতা দিয়েছেন, তাঁর প্রতিটি বক্তব্যই আমাদের চেতনায়, আমাদের রক্তে, আমাদের বিপ্লবে, আমাদের সংগ্রামের প্রেরণার মূল চেতনা।’

জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি আইন একটি রাজনৈতিক দলিল। প্রতিটি আইন সরকারের একটি পাবলিক পলিসি। সরকারের পক্ষ থেকে যে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, সেটা আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সরকার, আমাদের সরকার, বিএনপির সরকার, জুলাই যোদ্ধাদের সরকার, জুলাই চেতনার সরকার সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দিয়েছে এবং সেটাই রাজনৈতিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।’

আইনমন্ত্রী জানান, এর বাইরে কোনো সুরক্ষার প্রয়োজন হলে নির্দিষ্টভাবে জানালে সেটিও আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন