Ridge Bangla

স্মার্টফোন বন্দি তরুণ প্রজন্ম: আধুনিকতার আড়ালে অবক্ষয়

বর্তমান সময়ের এই ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এখন পরিণত হয়েছে জীবনযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশে গত এক যুগে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির এই বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নানা সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের আশঙ্কাও বাড়িয়ে তুলেছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সময়ে সময়ে এ-সংক্রান্ত নানা খবর দেখা যাচ্ছে, যা স্মার্টফোন ব্যবহারের আসক্তির ফলে তৈরি হওয়া সমস্যার গভীরতা নির্দেশ করছে।

বাংলাদেশে মূলত সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে স্মার্টফোন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এটি শিক্ষা, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ- সবকিছুর প্রধান মাধ্যম। মানুষ এখন চাইলে স্মার্টফোন দিয়ে করতে পারে না- এমন কাজের সংখ্যা হাতে গোনা। ফলে উঠতি বয়সের তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে স্মার্টফোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে আসক্তির রূপ নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে তরুণদের মধ্যে একধরনের ডিজিটাল নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে, যা আচরণগত আসক্তির মতো কাজ করছে।

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এমনই এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৫% তরুণ অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও উচ্চ মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে রাত জেগে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে দেখা দিচ্ছে নিদ্রাহীনতা। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে মনোযোগের ঘাটতি থেকে শুরু করে একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

অতিরিক্ত স্মার্টফোন নির্ভরশীলতার ফলে সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটছে। বাস্তব সামাজিক সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে মানুষের মুখোমুখি যোগাযোগ, পরিবারে সময় দেওয়ার প্রবণতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, বন্ধুত্ব হয়ে পড়ছে ভার্চুয়াল নির্ভর। বিকেলে খেলার মাঠে গিয়ে খেলাধুলা, সুস্থ আড্ডার মতো বিষয়গুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে তরুণরা এখন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে মেসেজ, ভয়েস কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে ভিডিও কলের মতো পন্থাগুলো বেছে নিচ্ছে। মানুষ এখন এক ঘরের একই বিছানায় বসে থেকেও একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। যার ফলে সম্পর্কের মূল্য কমছে ধীরে ধীরে, বাড়ছে দাম্পত্য কলহ।

যদিও বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন শিক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, কিন্তু এর অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের সহায়তার চেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পড়াশোনার সময় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বিভ্রান্তি ঘটছে হরহামেশাই। কেউ একজন পড়তে বসে একটু ফোনে স্ক্রলিং করতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন রিলস, অনলাইন গেমসহ টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে। ফলে মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশোনায়, পরীক্ষার ফলাফলে দেখা দিচ্ছে অবনতি। পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে না পেরে যে আত্মহত্যার ঘটনা মাঝেমধ্যে সামনে আসে, এর পেছনেও পরোক্ষভাবে দায়ী স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার।

স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজে বিভিন্ন অনৈতিক ও অনুপযুক্ত কনটেন্টে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে অশালীন কনটেন্টে আসক্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে ভুয়া পরিচয় তৈরির মতো বিষয়গুলো। এছাড়াও এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে ডিপ-ফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা গুজব থেকে শুরু করে বিভিন্ন সহিংসতা উসকে দেওয়ার মতো কাজ করছে। এই ধরনের সমস্যাগুলো তরুণ সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে আত্মকেন্দ্রিকতা ও সহানুভূতির ঘাটতির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি মানুষকে এখন পারিবারিক আমেজ থেকেও দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। কোনো ছোটখাটো পারিবারিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে মানুষ এখন বাড়িতে খাবারও তৈরি করছে না। এই খাবারের বিষয়টিও এখন মোবাইল ফোনের কয়েক ক্লিকে পাশের কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে চলে আসছে, যা আমাদের যান্ত্রিক আচরণের একটি দিক তুলে ধরছে।

স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে সময় ব্যবস্থাপনার সংকটে ফেলে দিচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল আসক্তি তরুণদের কাজের দক্ষতা ও মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে তরুণরা বাস্তব জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলছেন। এর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে হবে। ডিজিটাল ডিটক্সের মাধ্যমে নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল থেকে দূরে থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খেলাধুলা, বই পড়া ও বিভিন্ন সামাজিক ইভেন্টে অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে বিকল্প কার্যক্রমে সময় দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যবহারের নীতিমালা শক্তিশালী করতে হবে।

স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণ প্রজন্মকে ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তির ফলে একাকিত্ব, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যায় ভুগে আত্মহননের মতো ভয়ানক পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকে। এই ধরনের সংবাদ চোখে পড়ছে অহরহ। বিষয়টি আমাদের সামনে পরিষ্কার, এখন প্রয়োজন সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। অন্যথায়, প্রযুক্তির আশীর্বাদই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অভিশাপে পরিণত হতে পারে।

This post was viewed: 10

আরো পড়ুন