রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গের অন্যতম প্রধান তেল টার্মিনালে রাতভর ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, স্থাপনাটি রাশিয়ার যুদ্ধ তহবিলে রাজস্ব সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর দাবি, একই অভিযানে ওই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুশ নৌঘাঁটিতেও আঘাত হানা হয়েছে। তবে নৌঘাঁটিতে হামলার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি রাশিয়া।
সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেকসান্ডার বেগলভ শহরে বড় ধরনের ড্রোন হামলার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি তেল টার্মিনালে আঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও জানিয়েছেন, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু হওয়া তেল টার্মিনালটি রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ স্থাপনা, যেখানে বছরে ১২.৫ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ক্রনশতাঁতে অবস্থিত রাশিয়ার বাল্টিক নৌবহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিও হামলার শিকার হয়েছে বলে কিয়েভ দাবি করেছে।
গভর্নর বেগলভ জানান, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে ৭২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। হামলার পর তিনি ৫০ লাখের বেশি বাসিন্দাকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন এবং মোবাইল ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন।
শনিবার (৪ জুন) সকালে জেলেনস্কি জানান, যেসব স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে সেগুলো ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও, তার প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ড্রোন উড়ে যেতে এবং পরে ওই এলাকা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। পরে বিবিসি ভিডিওটির সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা আরও জোরদার করেছে। কিয়েভের দাবি, এসব হামলার কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগারের প্রায় ৪৩ শতাংশ সক্ষমতা অচল হয়ে পড়েছে, যা দেশটিতে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে।
গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ইউক্রেনীয় হামলার কারণে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি বিরলভাবে স্বীকার করেন। শনিবার তিনি অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি নতুন বিলে স্বাক্ষর করেছেন।
এদিকে, পূর্ব ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর কোস্তিয়ান্তিনিভকা নিয়ে রাশিয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। সামরিক মুখপাত্র মেজর আন্দ্রি কোবালিভ বলেছেন, শহরটি এখনো ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি জানান, রুশ পদাতিক বাহিনীর ছোট ছোট দল ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা লাইনের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। তবে তাদের শনাক্ত করে ধ্বংস করা হচ্ছে।
এর আগে ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছিলেন, গত জুনেই কোস্তিয়ান্তিনিভকা শহরটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যদিও তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। এর জবাবে জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লিখেছেন, কোস্তিয়ান্তিনিভকা যদি সত্যিই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে পুতিন নিশ্চয়ই সেখানে এসে তার সাথে দেখা করতে এবং যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে কোনো সমস্যা বোধ করবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো পুতিন কখনোই ফ্রন্ট লাইন অতিক্রম করবেন না, কারণ সত্য পুতিনের কথার চেয়ে অনেক আলাদা।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, রাতভর এবং সকালে ইউক্রেনের ছোড়া ৫০০টিরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত ২ জুলাই কিয়েভে রাশিয়ার প্রাণঘাতী হামলার ক্ষয়ক্ষতি এবং কোস্তিয়ান্তিনিভকায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর ‘বিপর্যয়কর ব্যর্থতা’ থেকে জনগণ ও বিদেশি দাতাদের দৃষ্টি সরাতেই জেলেনস্কি এই হামলার নাটক করছেন। একই সঙ্গে মস্কো হুঁশিয়ারি দিয়েছে, রাশিয়ার বেসামরিক স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার জবাব দেওয়া হবে।