Ridge Bangla

শিক্ষার্থীদের মাঝে কেন বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা?

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা এখন এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বয়সে পড়াশোনা, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজে মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই তরুণরা বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। সাম্প্রতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, এটি আর এখন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক সংকটের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা আগের বছর (২০২৪ সাল) সংস্থাটির প্রকাশিত সংখ্যা ৩১০-এর চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত ওই বছরের পরিসংখ্যানে আরও উঠে এসেছে, আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬১.৮ শতাংশ (২৪৯ জন) শিক্ষার্থী নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬১.৮ শতাংশ) কিশোর-কিশোরী (১৩-১৯ বছর বয়সী)। শিক্ষা স্তর অনুসারে দেখা যায়, স্কুল পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ১৯০ জন (৪৭.৪০ শতাংশ), কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন (২২.৮ শতাংশ), বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন (১৯.১০ শতাংশ) এবং মাদরাসায় ৪৪ জন (১০.৭২ শতাংশ) আত্মহত্যা করেছেন।

বিগত কয়েক বছরে ফাউন্ডেশনটির প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫১৩ জন, ২০২২ সালে ৫৩২ জন। আর ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে প্রায় ৬১% পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রবণতার কারণ অনুসন্ধানে করা বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে উঠে এসেছে-

মানসিক স্বাস্থ্য সংকট

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৮ শতাংশ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সরাসরি বিষণ্নতা জড়িত। তুলনামূলক বড়দের ওপর চালানো (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের) গবেষণায়ও একই চিত্র দেখা যায়। ডিপ্রেশন, স্ট্রেস এবং উদ্বেগ আত্মহত্যা প্রবণতার মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন অনেকেই।

কিশোর বয়স এমন একটি সময়, যখন আবেগীয় অস্থিরতা স্বাভাবিক। কিন্তু এই সময়ে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং করা না গেলে তা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ও সহায়তা না থাকলে শিক্ষার্থীরা সহজেই হতাশার ফাঁদে পড়ে যায়। যা ধীরে ধীরে তাদেরকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে ভয়ানক পথে চালিত করতে পারে।

শিক্ষায় প্রতিযোগিতা ও চাপ

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং ফলাফলনির্ভর। ভালো ফলাফল অর্জনের চাপ, পরীক্ষাভীতি এবং ব্যর্থতার ভয় শিক্ষার্থীদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে। গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পেছনে ‘একাডেমিক চাপ’ একটি বড় কারণ। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশাও এই চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভালো ফল না করলে সামাজিক লজ্জা বা পারিবারিক হতাশার আশঙ্কা অনেক শিক্ষার্থীকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।

পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৩ শতাংশ আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে মানসিক অস্থিরতা বা সম্পর্কজনিত সমস্যা। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ভালোবাসার সম্পর্কের জটিলতা, কিংবা অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব শিক্ষার্থীদের একাকিত্ব বাড়ায়। আধুনিক নগরজীবনে পরিবারগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে, অভিভাবকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। ফলে সন্তানদের সঙ্গে পরিবারের মানসিক সংযোগ কমে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চাপ

বাংলাদেশের সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কম। আত্মহত্যা বা মানসিক সমস্যাকে অনেক সময় লজ্জাজনক হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও সম্পর্কজনিত চাপ তাদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। যার প্রতিফলন উঠে এসেছে পরিসংখ্যানে।

কোভিড-পরবর্তী বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক চাপ

কোভিড-১৯ মহামারির পর শিক্ষার্থীদের জীবনে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। অনলাইন শিক্ষা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক সংকট- সব মিলিয়ে তাদের মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার চিন্তার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক চাপ, বিশেষ করে টিউশন ফি, ভবিষ্যৎ চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তাগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

এই সংকট মোকাবিলায় একক কোনো সমাধান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং সেন্টার থাকা জরুরি। সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যই নয়, মানসিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন কমিয়ে সৃজনশীলতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। ভালো রেজাল্ট করতেই হবে, নাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার- এই ধরনের চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো হতে পারে শিক্ষার্থীদের আত্মহননের মতো বিষয় থেকে দূরে রাখার যুগোপযোগী সমাধান।

এক্ষেত্রে সরকারেরও উচিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ট্যাবু ভাঙতে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করা। যেহেতু উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার এই প্রবণতা বেশি, তাই তাদের মানসিক সমস্যার লক্ষণ শনাক্ত করতে এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কাজও করতে পারে সরকার। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো যাবে অনেকটাই বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা। মানুষের জীবনে হতাশা-একাকীত্বের মতো বিষয়গুলো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় একজন মানুষের মস্তিষ্কের আবেগীয় অঞ্চল যতটা উদ্দীপ্ত থাকে, যৌক্তিক অঞ্চল ঠিক ততটাই নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে ওই মুহূর্তে মানুষ সমস্যা সমাধানের যৌক্তিক রাস্তাগুলো হারিয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে জীবন বিপন্নকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পরিসংখ্যান আমাদের সতর্ক করছে, কিন্তু শুধু উদ্বেগ প্রকাশে সমাধান হবে না। এ সমস্যা সমাধানে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সমাজ সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে।

কারণ, প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া জীবন শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি সম্ভাবনার অপচয়, এক স্বপ্নের মৃত্যু, একটি পরিবারের আজীবনের কান্না।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন