Ridge Bangla

মায়ের মরদেহ পেতে ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগ

রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে হাতাহাতির অভিযোগ ঘিরে দিনভর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার পর মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে মৃত রোগীর ছেলে রিফাত হোসেনকে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

রোগীর পরিবারের দাবি, অক্সিজেন না দেওয়ার কারণে নূর নাহার বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলে চিকিৎসকদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর রিফাত হোসেন দুই চিকিৎসককে মারধর করেছেন।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বিক্ষোভ চলে। চিকিৎসকদের ওপর হামলার বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে মরদেহ ফেরত পাওয়ার দাবিতে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন মৃতের স্বজনরা।

স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি আড়াল করতে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা মরদেহ আটকে রাখেন। দীর্ঘ সময় নানা দাবি জানানোর পর রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে ডাকা হয়। পরে তাকে কান ধরে ওঠবস করানোর পর মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে দেওয়া হয়।

এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। পরে রিফাত হোসেনের কান ধরে ওঠবস করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূর নাহার বেগমকে শনিবার ভোরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। এরপর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ জানান তার ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়।

এ ঘটনায় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ও ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিব হাসান মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন এবং একপর্যায়ে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর দুপুর দেড়টার দিকে আবার চিকিৎসাসেবা চালু হয়।

রোগীর স্বজনদের দাবি, মৃত্যুর পর নূর নাহার বেগমের মরদেহ আইসিইউতে রাখা হয় এবং পরিবারের কাউকে দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে মরদেহ বাড়ি নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী বাধা দেন। এরপর মরদেহ মর্গে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

তবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ বলেন, চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। তবে কোনো মরদেহ আটকে রাখা হয়নি।

পরে রিফাত হোসেন হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে আছেন জানতে পেরে সেখানে জড়ো হন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। তারা রিফাতকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর দাবি জানান। পরে পরিচালকের কার্যালয়ের ভেতরে তাকে ১০ বার কান ধরে ওঠবস করানোর পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মরদেহ ফেরত চেয়ে হাসপাতালের সামনে সড়ক অবরোধের সময় মৃতের ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু বলেন, ‘আমার মা ভোরে মারা গেছেন, অথচ এখন পর্যন্ত তার মুখটা দেখতে পারিনি। তারা লাশ অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিয়ে মর্গে রেখেছে। আমরা বারবার ক্ষমা চেয়ে মরদেহ চেয়েছি, কিন্তু তারা দিচ্ছিল না।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনা দেখা গেছে। এটি অত্যন্ত অমানবিক ঘটনা।

মরদেহ আটকে রাখা ও জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। তবে অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় অতিরিক্ত ভিড় থাকায় নিরাপত্তার কারণে সেটি মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ দাখিল করা হবে এবং অভিযুক্ত ছেলেকে পুলিশের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে।

This post was viewed: 1

আরো পড়ুন