Ridge Bangla

ব্যাটারির বিষে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য

ঢাকাসহ সারা দেশের অলিগলিতে এখন পরিচিত দৃশ্য নিঃশব্দে ছুটে চলা ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক। ডিজেল বা পেট্রোলচালিত যানবাহনের মতো কালো ধোঁয়া ছড়ায় না বলে এগুলোকে অনেকেই ‘পরিবেশবান্ধব’ তকমা দিয়ে বসেছেন। কিন্তু দৃশ্যত ধোঁয়াহীন এই বাহনগুলো যে আমাদের মাটি, পানি ও বায়ুকে বিষাক্ত সিসায় পরিপূর্ণ করে তুলছে, তা অনেকেরই অগোচরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাহনগুলো এখন জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, যার বেশিরভাগই চলে লেড-এসিড ব্যাটারিতে। একটি ইজিবাইক বা অটোরিকশা সক্রিয় রাখতে বছরে অন্তত ৫ থেকে ৭টি ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। এই ধরনের একটি ব্যাটারিতে থাকে ১৮-২০ কেজি ওজনের সিসা। সেই হিসাবে, বছর শেষে লাখ লাখ টন ব্যাটারি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে রিকশা ও ইজিবাইকে এই ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে।

তবে মূল সমস্যাটি কেবল বর্জ্য তৈরিতে নয়, বরং এর ব্যবস্থাপনায়। এই ব্যাটারিগুলো যখন কার্যকারিতা হারায়, তখন অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে এগুলোকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ব্যাটারি ভাঙার কারখানায় শিশু ও দরিদ্র শ্রমিকরা সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করছে। ভাঙার পর তারা সেই সিসা কোনো প্রকার সুব্যবস্থা ছাড়াই পানি দিয়ে পরিষ্কার করছে। এরপর উচ্চ তাপে সিসাগুলোকে গলানো হচ্ছে, যার ফলে বিষাক্ত সিসার কণা বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে ও ধুয়ে পরিষ্কার করার ফলে পানির সাথে মিশে আমাদের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় ব্যাটারির ভেতরে থাকা সালফিউরিক এসিড এবং সিসা সরাসরি মাটি ও পানিতে মিশে যায়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রচলিত উপায়ে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের সময় প্রায় ২০ শতাংশ সিসা সরাসরি পরিবেশে নিক্ষিপ্ত হয়।

এসব সিসা ধ্বংস হয় না, বরং প্রকৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। সিসাযুক্ত পানি জলাশয়ের মাছ থেকে শুরু করে খাদ্যচক্র ও ভূগর্ভস্থ পানির সাথে মিশে নানা উপায়ে মানবশরীরে প্রবেশ করছে। এই সিসাযুক্ত পানি দিয়ে চাষাবাদ করায় তা ফসলের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে যুক্ত হচ্ছে, যা প্রবেশ করছে আমাদের আমিষের যোগানদাতা গৃহপালিত প্রাণীগুলোর শরীরেও। ফলে আজ আমরা যা খাচ্ছি, তার বড় একটি অংশই সিসাযুক্ত, যা আমাদের বিশাল স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

সিসা একটি ভারী ধাতু, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) মতে, সিসার প্রভাবে শিশুদের বুদ্ধি (আইকিউ) কমতে থাকে, স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শ্রবণশক্তির সমস্যা দেখা দেয়। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিসা দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। আমাদের দেশে ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার চেয়েও বেশি সিসা পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপদসংকেত।

শুধু শিশুই নয়, বয়স্কদের ক্ষেত্রেও উচ্চ রক্তচাপ, প্রজননে অক্ষমতা, স্মরণশক্তি হ্রাস এবং কিডনির জটিল রোগের জন্য সিসা দায়ী। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক দীলিপ দত্তের মতে, এই সিসা দূষণ দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে মেধাশূন্য ও প্রতিবন্ধিতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি বলেন, পরিবেশের চেয়ে মানবদেহের জন্য বেশি ক্ষতিকর এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারির এসিড ও সিসা। এতে সালফিউরিক এসিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সিসা বিদ্যমান থাকে, যা বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। এর ফলে ক্যানসারও হতে পারে।

ব্যাটারিচালিত বাহনগুলো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলেও, অনিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবিরোধী উপায়ে ব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত্রতত্র ব্যাটারি ভাঙা বন্ধ করে অনুমোদিত ও পরিবেশসম্মত রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও সরকার ও সংশ্লিষ্টদের উচিত লেড-এসিড ব্যাটারির পরিবর্তে লিথিয়াম-আয়ন বা সৌরবিদ্যুৎচালিত প্রযুক্তির ব্যবহারে চালকদের সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান করা।

সর্বোপরি সাধারণ মানুষকে এই নীরব বিষের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং অবৈধ ব্যাটারি ভাঙার কারখানার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা যদি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়, তবে সেই উন্নয়নের চড়া মূল্য যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে না হয়, সেদিকেই লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের সবার।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন