সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারবহির্ভূত হামলা ও মারধরের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের হতে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই ধরনের ঘটনা দফায় দফায় ঘটছে।
হামলার শিকার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষ। অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকেই আটক করছে।
পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনায় দেশে এসব ভায়োলেন্স যেন মারাত্মক সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ ও দাবির নামে অনেকে প্রশাসন বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালাচ্ছে, জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র নিচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে হামলা চালানো সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ জাতীয় পরিচিত ব্যক্তিরাও এর শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, কাউকে বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩১ নাগরিকদের আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং অনুচ্ছেদ ৩৫ (৩) ফৌজদারি অপরাধে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচারের অধিকার প্রদান করে।
হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে গত দেড় দশকের সরকারের সময় সরকার, মন্ত্রী, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় সকলেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভয়াবহ সব দুর্নীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।
তবে সেসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ নিরপরাধ মানুষও হয়েছেন হয়রানির শিকার। এভাবেই ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইল চুরির অভিযোগে তোফাজ্জল নামে এক ভবঘুরেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
চলতি বছরের ৯ আগস্ট বিয়ে কথা পাঁকা করতে যাওয়ার সময় রংপুরের তারাগঞ্জ বাজারে চোর সন্দেহে রুপলাল দাস ও প্রদীপ লাল দাস নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা।
মাদারীপুরে চোর সন্দেহে ১০ আগস্ট ৪ জনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে একজনের চোখ উপড়ে ফেলা হয়। গাজীপুরের টঙ্গিতে মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে ১১ আগস্ট পিটিয়ে হত্যা করা হয় এক যুবককে।
এসব ঘটনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে আসামী শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হলেও তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাবলে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে।
রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরণের বিচারবহির্ভূত অন্যায় ও সন্ত্রাস দেশের জন্য অশনিসংকেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা বলেন, “আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং বিচারহীনতার কারণে এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে।
আইন অনুযায়ী অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।” অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা সকল রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মীরা সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখ করেছেন। সামগ্রিকভাবে, এসব বিচারবহির্ভূত হামলা ও সন্ত্রাসের বৃদ্ধি দেশের আইনের শাসন ও সামাজিক শান্তির জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। তাই এসবের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।