Ridge Bangla

ফুটবল বনাম ফুটসাল: একই ডিএনএ, ভিন্ন প্রেক্ষাপট

​ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা- এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। তবে ফুটবলেরই একটি ছোট এবং দ্রুততর সংস্করণ হিসেবে ‘ফুটসাল’ গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে দুটি খেলাকে একই মনে হলেও, নিয়মকানুন, মাঠের গঠন এবং কৌশলের দিক থেকে এদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। পেলের শৈশব থেকে শুরু করে নেইমারের জাদুকরী ড্রিবলিং- সবকিছুর পেছনেই রয়েছে ফুটসালের অবদান।

খেলার মাঠ ও পৃষ্ঠ

​ফুটবল সাধারণত বিশাল ঘাসের মাঠে (প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম) খেলা হয়। একটি আদর্শ ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য ১০০-১১০ মিটার এবং প্রস্থ ৬৪-৭৫ মিটার হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ফুটসাল খেলা হয় ইনডোরে বা ঘরের ভেতরে কঠিন পৃষ্ঠের (Hard court) ওপর। এটি সাধারণত কাঠ বা সিন্থেটিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। ফুটসাল মাঠের দৈর্ঘ্য ২৫-৪২ মিটার এবং প্রস্থ ১৬-২৫ মিটার। অর্থাৎ, ফুটসালের মাঠ ফুটবলের তুলনায় অনেক ছোট।

​বলের ধরণ

​ফুটবল ও ফুটসালের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি লুকিয়ে আছে এর বলের মধ্যে। ফুটবলে ৫ নম্বর সাইজের বল ব্যবহার করা হয়, যা বেশ হালকা এবং ঘাসের ওপর অনেক বেশি বাউন্স বা লাফাতে পারে। বিপরীতে, ফুটসালে ৪ নম্বর সাইজের ছোট বল ব্যবহার করা হয়। এই বলটি ফুটবলের বলের তুলনায় কিছুটা ভারী এবং এর ‘লো বাউন্স’ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেহেতু ফুটসাল শক্ত মাঠে খেলা হয়, তাই বল যাতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে লাফিয়ে না ওঠে, সেভাবেই এটি তৈরি করা হয়।

​খেলোয়াড় সংখ্যা ও পরিবর্তন

​একটি আদর্শ ফুটবল ম্যাচে প্রতি দলে ১১ জন করে খেলোয়াড় থাকে। সাধারণত ৩ থেকে ৫ জন খেলোয়াড় পরিবর্তনের সুযোগ থাকে এবং একবার মাঠ থেকে উঠে গেলে ওই ম্যাচে আর নামা যায় না। কিন্তু ফুটসালে প্রতি দলে ৫ জন খেলোয়াড় থাকে (৪ জন আউটফিল্ড প্লেয়ার এবং ১ জন গোলরক্ষক)। এখানে খেলোয়াড় পরিবর্তনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই এবং একে বলা হয় ‘ফ্লাইং সাবস্টিটিউশন’। অর্থাৎ, খেলা চলাকালীন যেকোনো সময় একজন খেলোয়াড় উঠে গিয়ে আরেকজন নামতে পারেন এবং আগের খেলোয়াড় চাইলে পুনরায় মাঠে ফিরতে পারেন।

খেলার সময় ও ঘড়ি

​ফুটবল ম্যাচ নির্ধারিত ৯০ মিনিটের হয়, যা ৪৫ মিনিটের দুটি অর্ধে বিভক্ত। এতে ‘রানিং ক্লক’ ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ বল মাঠের বাইরে গেলেও সময় থামানো হয় না। শেষে কিছু ইনজুরি টাইম যোগ করা হয়। ফুটসালে খেলার সময় মোট ৪০ মিনিট (২০ মিনিটের দুটি অর্দ্ধ)। তবে এর বিশেষত্ব হলো ‘স্টপ ক্লক’ সিস্টেম। যখনই বল মাঠের বাইরে যায় বা ফাউল হয়, ঘড়ি থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পুরো ২০ মিনিটই খেলা হয়। এছাড়া ফুটসালে প্রতিটি দল প্রতি অর্ধে এক মিনিটের ‘টাইম আউট’ নিতে পারে, যা প্রথাগত ফুটবলে অসম্ভব।

​অফসাইড ও থ্রো-ইন

​ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত এবং জটিল নিয়ম হলো ‘অফসাইড’। তবে ফুটসালে কোনো অফসাইড নিয়ম নেই, যা খেলাটিকে আরও আক্রমণাত্মক ও গতিশীল করে তোলে। আবার ফুটবলে বল সাইডলাইনের বাইরে গেলে হাত দিয়ে ‘থ্রো-ইন’ করতে হয়। ফুটসালে এর পরিবর্তে পা দিয়ে ‘কিক-ইন’ করা হয়। কিক-ইন করার জন্য একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ ৪ সেকেন্ড সময় পান।

​ফাউল ও লাল কার্ডের নিয়ম

​ফুটবলে একজন খেলোয়াড় লাল কার্ড পেলে তার দল বাকি সময় একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে খেলে। ফুটসালেও লাল কার্ড আছে, তবে নিয়মটি একটু ভিন্ন। লাল কার্ড পাওয়া খেলোয়াড় মাঠের বাইরে চলে যান এবং তার দল ২ মিনিটের জন্য একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে খেলে। তবে এই ২ মিনিটের মধ্যে যদি প্রতিপক্ষ গোল দিয়ে দেয়, তবে তখনই একজন নতুন খেলোয়াড় মাঠে নামতে পারেন। এছাড়া ফুটসালে ‘অ্যাকুমুলেটেড ফাউল’ (Accumulated Fouls) বলে একটি নিয়ম আছে। প্রতি অর্ধে একটি দল ৫টি ফাউল করার পর, ষষ্ঠ ফাউল থেকে প্রতিপক্ষকে সরাসরি ‘সেকেন্ড পেনাল্টি মার্ক’ (১০ মিটার দূর) থেকে শট নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

​কৌশল ও দক্ষতা

​ফুটবল অনেক বেশি শারীরিক শক্তি, দীর্ঘ দৌড় এবং লং পাসের খেলা। এখানে মাঠ বড় হওয়ায় খেলোয়াড়রা কৌশল সাজানোর সময় পান। কিন্তু ফুটসাল হলো ‘ক্লোজ কন্ট্রোল’ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার খেলা। খুব ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং এবং ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণ সাজাতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ফুটসাল খেলোয়াড় ফুটবল খেলোয়াড়ের তুলনায় ১২ গুণ বেশি বল স্পর্শ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত খেলোয়াড়ের দক্ষতা বৃদ্ধির পেছনে ফুটসালের অবদান রয়েছে।

​ফুটবল ও ফুটসাল একে অপরের পরিপূরক। ফুটবল যেখানে উন্মুক্ত আকাশের নিচে উন্মাদনার নাম, ফুটসাল সেখানে গতির লড়াই। ফুটবল ধৈর্য ও স্ট্যামিনার পরীক্ষা নেয়, আর ফুটসাল পরীক্ষা নেয় মেধা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার। বিশ্ব ফুটবলের মানোন্নয়নে বর্তমানে ফুটসালকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। আপনি যদি গতির সাথে টেকনিকের মিশেল পছন্দ করেন, তবে ফুটসালকে গুরুত্ব দিতে পারেন। এখানে মুভমেন্ট অনেক দ্রুত হয়। আর প্রথাগত বড় মাঠের খেলা পছন্দ হলে তো ফুটবল আছেই।

This post was viewed: 10

আরো পড়ুন