Skip to main content

Ridge Bangla

পেপ গার্দিওলা: সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচের ফিলিস্তিনের প্রতি ভালোবাসা

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে যারা কেবল মাঠের কৌশল বা ট্রফি জয়ের সংখ্যার জন্য অমর হয়ে থাকেন না, বরং মাঠের বাইরের মানবিক অবস্থান তাদের নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। আধুনিক ফুটবলের শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে পেপ গার্দিওলার নাম যখন উচ্চারিত হয়, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে বার্সেলোনা কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির অভাবনীয় সব সাফল্য। কিন্তু এই প্রখর ফুটবল মস্তিষ্কের আড়ালে বাস করে এক সংবেদনশীল ও প্রতিবাদী হৃদয়। পেপ গার্দিওলা কেবল একজন সফল কোচ নন, তিনি বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার এক সাহসী কণ্ঠস্বর। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সমর্থন এবং মানবিক সহানুভূতি ফুটবল দুনিয়ায় তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

​সাফল্যের শিখরে এক প্রতিবাদী সত্তা

গার্দিওলা বরাবরই রাজনৈতিকভাবে সচেতন একজন মানুষ। তাঁর নিজের জন্মভূমি কাতালুনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা- সবখানেই তিনি সোচ্চার। ফুটবল মাঠে তিনি যেমন ‘টিকি-টাকা’ কিংবা ‘ইনভার্টেড ফুলব্যাক’ কৌশলে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, মাঠের বাইরেও তেমনি তিনি সাধারণ মানুষের ওপর অবিচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। অনেক কোচ বা খেলোয়াড় যেখানে বাণিজ্যিক স্বার্থে বা বিতর্ক এড়াতে স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে ভয় পান, সেখানে গার্দিওলা বরাবরই ব্যতিক্রম।

​ফিলিস্তিন ইস্যু ও গার্দিওলার সংহতি

ফিলিস্তিনের প্রতি গার্দিওলার ভালোবাসা বা সংহতি কেবল আজকের নয়। বছরের পর বছর ধরে তিনি বিভিন্নভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্যাতনের প্রতিবাদ করে আসছেন। ২০১৩ সালে যখন তিনি বার্সেলোনার কোচের দায়িত্ব ছাড়েন, তখন তিনি ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা অঞ্চলের মানুষের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময় ফিলিস্তিনি ফুটবলার মাহমুদ সারসাক, যিনি ইসরায়েলি কারাগারে দীর্ঘকাল বন্দী ছিলেন এবং অনশনের মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছিলেন, তাঁকে বার্সেলোনা ক্লাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও এটি একটি ক্লাবের সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু এর পেছনে গার্দিওলার মানবিক দর্শনের প্রভাব অনস্বীকার্য ছিল।

​সাম্প্রতিক সংকট ও গার্দিওলার সাহসী বয়ান

২০২৩ এবং ২০২৪ সালে গাজায় যখন মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছায়, তখন পেপ গার্দিওলা যেভাবে কথা বলেছেন, তা অনেকের চোখ খুলে দিয়েছে। একটি সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বিশ্বনেতাদের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন বিশ্ববিবেক গাজার শিশুদের আর্তনাদ শুনতে পায় না? তিনি ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, “পুরো বিশ্ব আজ ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীরব দর্শক হয়ে আছে। আমরা কেবল তখনই কথা বলি যখন আমাদের স্বার্থ থাকে। কিন্তু যেখানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, সেখানে আমাদের নীরবতা আসলে সম্মতির নামান্তর।”​

গার্দিওলার এই অবস্থান কেবল মৌখিক সহমর্মিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময়ে ম্যানচেস্টার সিটির ট্রফি উদযাপনের সময়ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং ক্লাবের পরিবেশের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ফুটে উঠেছে। তাঁর কন্যা মারিয়া গার্দিওলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনের পক্ষে অত্যন্ত সোচ্চার এবং বাবার মতোই তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। গার্দিওলা পরিবারের এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিন সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

​কেন গার্দিওলা অনন্য?

ফুটবল জগতে বর্তমানে বিশাল অর্থের খেলা চলে। বড় বড় ক্লাবের মালিকানা প্রায়শই বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে যুক্ত থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি রাজনৈতিক বা মানবিক কোনো সংকট নিয়ে মুখ খোলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু গার্দিওলা সেই ঝুঁকি নিতে কখনো পিছপা হননি। তিনি মনে করেন, ফিলিস্তিনের সংকট কোনো ধর্মীয় যুদ্ধ নয়, এটি একটি মানবিক সংকট। দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এবং নিজ ভূখণ্ডে শান্তিতে থাকার অধিকারের পক্ষে কথা বলা যে কোনো মানুষের নৈতিক দায়িত্ব- গার্দিওলা এই সত্যটিই বারবার মনে করিয়ে দেন।

​মাঠের কৌশল বনাম মানবতার দর্শন

গার্দিওলাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ফুটবল নাকি মানবতা কোনটি তাঁর কাছে বড়, তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে ফুটবল একটি খেলার চেয়ে বেশি কিছু নয়, কিন্তু মানুষের জীবন অমূল্য। তাঁর ফুটবল দর্শনে যেমন পরোপকারিতা (Selflessness) এবং টিমওয়ার্কের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সেই আদর্শ বজায় রাখেন। তিনি মনে করেন, একজন কোচ হিসেবে তিনি কেবল তাঁর খেলোয়াড়দের ফুটবল শেখান না, বরং তাদের ভালো মানুষ হতেও অনুপ্রাণিত করেন। ফিলিস্তিনের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা মূলত তাঁর ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যানিজম’ বা সর্বজনীন মানবতাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ।

পেপ গার্দিওলা সর্বকালের সেরা কোচ কি না, তা নিয়ে ফুটবল বোদ্ধাদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যে সর্বকালের অন্যতম মানবিক এবং সাহসী ব্যক্তিত্বের কোচ, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ট্রফি কেবিনেটে অসংখ্য শিরোপা জমানোর চেয়েও তিনি গাজার অবরুদ্ধ মানুষের চোখের জল মুছতে এবং তাদের অধিকারের কথা বলতে বেশি আগ্রহী। যতদিন পৃথিবীতে অবিচার থাকবে, ততদিন গার্দিওলার মতো মানুষেরা ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার মশাল জ্বালিয়ে রাখবেন। ফিলিস্তিনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কেবল একটি দেশের প্রতি টান নয়, বরং তা হলো ন্যায়ের প্রতি অবিচল আস্থা। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পেপ গার্দিওলা তাই কেবল এক সেরা কৌশলবিদ নন, তিনি একজন সত্যিকারের ‘আইকন’।

This post was viewed: 30

আরো পড়ুন