Ridge Bangla

নোবেল শান্তি পুরস্কার: শান্তির স্বীকৃতি কেন বারবার বিতর্কের জন্ম দেয়?

​১৮৯৫ সালে আলফ্রেড নোবেল যখন তাঁর উইল লিখেছিলেন, তখন তিনি চেয়েছিলেন এমন ব্যক্তিদের সম্মানিত করতে যারা “জাতিসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধিতে এবং যুদ্ধ নিরসনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবেন।” কিন্তু গত একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখা গেছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার যতটা না শান্তির বার্তা দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জন্ম দিয়েছে বিতর্কের। পদার্থবিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই পুরস্কার দেওয়া হয় না বলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু কেন এই বিশ্বখ্যাত পুরস্কারটি প্রতি বছরই আলোচনার চেয়ে সমালোচনার কেন্দ্রে বেশি থাকে?

​নোবেল শান্তি পুরস্কারের অন্যতম বড় সমালোচনা হলো এটি অনেক সময় কাজ শেষ হওয়ার আগেই দিয়ে দেওয়া হয়। ওসলোর নোবেল কমিটি অনেক সময় কোনো নেতার ‘সদিচ্ছা’ বা ‘প্রতিশ্রুতি’ দেখে তাকে পুরস্কৃত করে, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০০৯ সালে বারাক ওবামার নোবেল জয়।

ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, কোনো দৃশ্যমান সাফল্য ছাড়াই তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ওবামা নিজেও পরবর্তীতে তাঁর আত্মজীবনীতে এই পুরস্কার পেয়ে বিস্মিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। একইভাবে ২০১৯ সালে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ইরিত্রিয়ার সাথে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ শেষ করার জন্য। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি নিজের দেশেই টাইগ্রে অঞ্চলে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যা এই পুরস্কারের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।

​২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন এটি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করে। মাচাদো একদিকে ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে বিদেশি ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়ার পক্ষপাতী, আবার তিনি ইসরায়েলের গণহত্যারও সমর্থক।

সমালোচকদের মতে, এই পুরস্কারটি শান্তির চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বিস্তারের একটি পরোক্ষ মাধ্যম হিসেবে ওসলোর এই সিদ্ধান্তকে দেখা হয়। মাদুরো সরকার একে ‘পুরস্কারের মোড়কে রাজনৈতিক চক্রান্ত’ হিসেবে অভিহিত করে। মাচাদোর এই জয় আবারও এই প্রশ্নটি সামনে এনেছে যে, নোবেল কমিটি কি প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার চেয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে অবস্থান নিতে বেশি পছন্দ করে?

​অনেক নোবেল বিজয়ী পুরস্কার পাওয়ার পর এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন যা শান্তির পরিপন্থী। অং সান সু চি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে ১৯৯১ সালে তিনি নোবেল পান। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর দেশের সেনাবাহিনীর হাতে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের সময় তাঁর নীরবতা এবং আন্তর্জাতিক আদালতে সেনাবাহিনীর পক্ষাবলম্বন বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। বিশ্বজুড়ে দাবি ওঠে তাঁর নোবেল কেড়ে নেওয়ার। একইভাবে ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরতির জন্য হেনরি কিসিঞ্জারকে যখন নোবেল দেওয়া হয়, তখন কমিটির দুজন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ কিসিঞ্জারের নির্দেশে কম্বোডিয়ায় চালানো ভয়াবহ বোমা হামলার ক্ষত তখনও শুকায়নি।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হিসেবে ধরা হয় মহাত্মা গান্ধীকে এই পুরস্কার না দেওয়াকে। অহিংস আন্দোলনের এই পুরোধা ব্যক্তিত্বকে পাঁচবার মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি কখনো নোবেল পাননি। নোবেল কমিটি পরবর্তীতে স্বীকার করেছে যে, গান্ধীকে পুরস্কার না দেওয়া ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল। কেবল গান্ধী নন, নেলসন ম্যান্ডেলা বা মাদার তেরেসার মতো মানুষরা পুরস্কার পেলেও টলস্টয় বা জওহরলাল নেহরুর মতো ব্যক্তিত্বরা এই তালিকায় স্থান পাননি, যা কমিটির মানদণ্ডকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

​নোবেল কমিটির মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং বিচারকদের আলোচনা অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়। ৫০ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত জানা যায় না কেন বা কাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার পর একজনকে বেছে নেওয়া হলো। এই অস্বচ্ছতা সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। কেন একজন বিতর্কিত ব্যক্তি মনোনীত হলেন আর একজন যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়লেন, তার কোনো ব্যাখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না।

আবার ​শান্তি কোনো ধ্রুবক বিষয় নয়। একজনের কাছে যা শান্তি, অন্যজনের কাছে তা হতে পারে পরাজয় বা অন্যায়। বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক নেতাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন সেই দেশের বড় একটি অংশ তাদের বিরোধী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত, আইজাক রবিন এবং শিমন পেরেজকে যখন যৌথভাবে নোবেল দেওয়া হয়, তখন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয় পক্ষের চরমপন্থীরাই এতে নাখোশ ছিল। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো জটিল বিষয়ে শান্তির মাপকাঠি নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব।

​এতসব বিতর্ক সত্ত্বেও নোবেল শান্তি পুরস্কারের আবেদন কমেনি। এই পুরস্কার বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট এবং শান্তির প্রয়োজনীয়তার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে ওসলোর নোবেল কমিটির জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই শান্তির কারিগরদের খুঁজে বের করাই হওয়া উচিত এই পুরস্কারের মূল লক্ষ্য। অন্যথায়, আলফ্রেড নোবেলের সেই মহৎ উদ্দেশ্য কেবল বিতর্কের বেড়াজালে আটকা পড়ে থাকবে।

This post was viewed: 15

আরো পড়ুন