চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। মহাসড়ক, জনপদ এবং বঙ্গোপসাগরের জলসীমা- সবখানেই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ অঞ্চলে অন্তত ৪৫টি ডাকাত ও দস্যু চক্র সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের গত পাঁচ বছরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জ এলাকায় ২০২১ সালে ডাকাতি ও দস্যুতার ২৬৫টি মামলা হয়েছিল। ২০২২ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৮টিতে। ২০২৩ সালে মামলা হয় ৩৬৮টি, ২০২৪ সালে ৪৬১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৮১টি। চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসেই এ ধরনের ঘটনায় ১৬৯টি মামলা হয়েছে, যা গড় হিসাবে আগের বছরের তুলনায় বেশি।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) নাজমুল হাসান বলেন, ‘ডাকাতি ও দস্যুতা রোধে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ভালো সাফল্য রয়েছে। এ পর্যন্ত যতগুলো মামলা দায়ের হয়েছে প্রায় মামলার আসামিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমানে যে অপরাধী চক্র গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ‘নগরীতে সক্রিয় অনেক ডাকাত সদস্যকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হয়েছে। বাইরে থাকা অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৫০ কিলোমিটারজুড়ে অন্তত ১৮টি স্থানে নিয়মিত ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম অংশের বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, বারইয়ারহাট, নিজামপুর ও সোনাপাহাড়, ফেনী অংশের লেমুয়া ব্রিজ, ফাজিলপুর ও মুহুরী প্রকল্প, কুমিল্লা অংশের মিয়াবাপবাজার, বিশ্বরোড, চান্দিনা, ইলিয়টগঞ্জ, গৌরিপুর ও টোল প্লাজা, এবং নারায়ণগঞ্জ অংশের মেঘনা টোল প্লাজা থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত এলাকাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়কে অন্তত ১৫টি সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি চক্রে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত তারা বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড সৃষ্টি, চলন্ত যানবাহনে পাথর নিক্ষেপ অথবা লোহার বিশেষ ধরনের পাত ব্যবহার করে টায়ার পাংচার করে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির যাত্রীদের কাছ থেকে মালামাল লুট করছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও। কক্সবাজারগামী পর্যটক, লবণ ব্যবসায়ী এবং মৎস্য ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে অন্তত ৭টি স্থানে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এ রুটে অন্তত ৫টি ডাকাত চক্র সক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জন্য জলদস্যুতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের জলসীমার ৬টি প্রধান এলাকায় জলদস্যুদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকা জেলেদের কাছে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে পরিচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, র্যাব ও কোস্টগার্ডের অভিযানে আগের অনেক শীর্ষ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করলেও বর্তমানে তাদের দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব ও নতুন গ্যাং লিডাররা এসব চক্র পরিচালনা করছে। পাশাপাশি মহাসড়ক ও জলসীমার মতো জনপদেও আন্তজেলা ডাকাত চক্রের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।