Ridge Bangla

খুন নাকি আত্মহত্যা? ২২ বছরেও খোলেনি তিন্নি হত্যা-রহস্যের জট

বাংলাদেশি বিনোদন জগতে স্বল্প সময়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উদিত হয়েছিলেন সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নি। ১৯৯৯ সালে র‍্যাম্প মডেলিং দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এই তরুণীর প্রতিভা ও গ্ল্যামারে অল্প সময়েই ধরা দিয়েছিল সাফল্য। কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল পথ হুট করেই মিশে যায় নিকষ কালো অন্ধকারে। ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাতে বুড়িগঙ্গা নদীর স্রোতে হারিয়ে যায় তিন্নির প্রাণচঞ্চল জীবন। মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার খুনি কে, এটা কি খুন নাকি আত্মহত্যা- সেসব প্রশ্নের উত্তর অধরাই রয়ে গেছে।

সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নির জন্ম ১৯৭৭ সালের ২২ অক্টোবর পুরান ঢাকার ওয়ারীতে। ইডেন কলেজের মেধাবী এই ছাত্রী হেনোলাক্স ক্রিম, স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্ক, লিজান মেহেদীসহ একাধিক জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ।

মামলার নথিপত্র এবং পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি বিমর্ষ ছিলেন। তার মৃত্যুর মামলায় গ্রেফতার হওয়া সাবেক স্বামী পিয়াল ১৬১ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে জানান, তিন্নি ছিলেন আত্মহত্যাপ্রবণ, দাম্পত্য কলহের কারণে পাঁচবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

একই ধরনের কথা উঠে আসে তিন্নির বাসার গৃহকর্মী, শেফালী, বীনা ও মামলা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্বাক্ষীদের বয়ানেও। তিন্নির ফুপু নার্গিস তাহের পুলিশের কাছে দেয়া তার বয়ানে বলেন, ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর বিকালে তিন্নি তাকে ফোন করে নাঈমা নামে তাদের একজন আত্মীয়ার আত্মহত্যার ঘটনার বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলেন, যিনি পোস্তগোলার বুড়িগঙ্গা ব্রিজের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে ইতিপূর্বে আত্মহত্যা করেছিলেন। এই কথোপকথনের পর তিন্নি সন্ধ্যায় কলাবাগানের বাসা থেকে তার বাবার কাছে গিয়ে এক আবেগঘন বিদায় নিয়েছিলেন। সেই রাতেই কেরানীগঞ্জের চীন মৈত্রী সেতুর ১১ নম্বর পিলারের নিচে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ।

তিন্নির লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে কোনো দাবিদার না থাকায় বেওয়ারিশ হিসেবে সেটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কর্তৃক জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুর পরদিন কেরানীগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। শুরুতে একে আত্মহত্যা মনে করা হলেও পরবর্তী তদন্তে তা হত্যাকাণ্ডের দিকে মোড় নেয়। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভির নাম।

মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, স্বামী পিয়ালের মাধ্যমেই তিন্নির সঙ্গে অভির পরিচয় হয়। দ্রুতই তিন্নি ও অভির ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। পিয়াল বিষয়টি ভালোভাবে নিতে না পারলে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে অভি ২০০২ সালের ৬ নভেম্বর তিন্নিকে দিয়ে পিয়ালকে ডিভোর্স করান। কিন্তু মুখে ভালোবাসা ও বিয়ের কথা বললেও বাস্তবে বিয়ে করে তিন্নিকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার ইচ্ছা অভির ছিল না।

এই বিষয়টি বুঝতে পেরে তিন্নি বিয়ের জন্য অভিকে চাপ দেন। চাপ দেওয়ায় তিন্নিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব সিআইডির কাছে যাওয়ার পর আট বছরে ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়। অবশেষে ২০১০ সালে গোলাম ফারুক অভিকে একমাত্র আসামি করে চার্জশিট দাখিল করা হয়। কিন্তু অভিযুক্ত অভি আগে থেকেই দেশের বাইরে থাকায় বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ৪১ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয় দীর্ঘ সময়ে।

গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ সালে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত এই আলোচিত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিচারক মোছা. শাহীনুর আক্তার রায়ে জানান, রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে একমাত্র অভিযুক্ত গোলাম ফারুক অভিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

এই রায়ের পর তিন্নির ৭৮ বছর বয়সী বাবা সৈয়দ মাহবুব করিম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার মেয়ে খুন হয়েছে এটা তো সত্য। তাহলে আমার মেয়ের খুনি কে? সেই উত্তর পাওয়ার অধিকার কি বাবার নেই? তিনি জানান, বয়সের ভারে এবং অসুস্থতায় তার আর নতুন করে বিচারের জন্য লড়াই করার ক্ষমতা নেই।

রাষ্ট্রপক্ষ রায়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও মামলার প্রাথমিক তদন্তে ত্রুটি এবং চাক্ষুষ সাক্ষীর অভাবকে আসামির খালাসের কারণ হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা। তবে দীর্ঘ ২২ বছর পর দেওয়া এই রায় এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রায়ে তিন্নি কি হত্যার শিকার হয়েছিলেন নাকি আত্মহত্যা করেছিলেন তা জানা যায়নি।

তিন্নি আজ নেই ২ দশকের বেশি সময় হলো। এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো এটা স্পষ্ট নয় যে, তার মৃত্যুটা কীভাবে হয়েছে। সেটা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য!

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন