পারস্য উপসাগরের এক উপদ্বীপে ছোট এক দেশ কাতার। এর একদিকে নির্মম মরুভূমি, আরেকদিকে সাগরের সুনীল জলরাশি। প্রায় সাড়ে এগার হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের কাতারের একমাত্র স্থল প্রতিবেশী সৌদি আরব। ২০২৪ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী এখানে বাস করে প্রায় তিন মিলিয়ন লোক। মজার ব্যাপার হলো এদের শতকরা ৮৫ ভাগই প্রবাসী শ্রমিক বা ব্যবসায়ী। দাপ্তরিক ভাষা আরবি হলেও কসমোপোলিটান এই দেশে ইংরেজির আধিক্যও চোখে পড়ে, বিশেষ করে ব্যবসাখাতে।
গত শতকের মধ্যভাগেও কাতার ছিল একেবারেই সাধারণ এক জনবসতি। মাছ ধরে আর মুক্তাচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতো এর অধিবাসীরা। কয়েক দশকের ব্যবধানে এই কাতারই এখন ঝাঁ চকচকে এক দেশ-আকাশছোঁয়া দালান, আধুনিক রাস্তাঘাট আর আপাদমস্তক বিলাসব্যসনে মোড়া। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আসর আয়োজনের মাধ্যমে কাতার বৈশ্বিক দরবারেও প্রমাণ করেছে তাদের সক্ষমতা। কিন্তু কী এমন জাদুর ছোঁয়ায় পাল্টে গেল মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ?
অর্থনীতির বিবর্তন
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত অংশে কাতারের অবস্থান। ফলে বহু আগে থেকেই সহজ নৌ-যোগাযোগ আর বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল এই দেশ। উনবিংশ শতক অবধি কাতার ছিল উসমানী সালতানাতের অধীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীদের পরাজয়ের পর তারা পরিণত হয় ব্রিটিশ প্রোটেক্টরেটে। এর মানে কাতারের নিরাপত্তা আর পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া বাকি সব পরিচালিত হতো স্থানীয় শাসকদের দ্বারা।
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল মাছ শিকার, জলযান নির্মাণ এবং সমুদ্রতল থেকে তুলে আনা মুক্তো। কাতারের উপকূল মুক্তোর জন্য বিখ্যাত। স্থানীয় জনপদের সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম যোগসূত্র ছিল এই মুক্তো।
বিংশ শতকের প্রারম্ভেও সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু এরপরেই বিশ্ব প্রবেশ করল মহামন্দার দশকে। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা পড়ল চাষ করা মুক্তোর প্রসারে। দুইয়ে মিলে ধ্বসে পড়ে কাতারের মুক্তোশিল্প। এই সময়েই ১৯৪০ সালে দুখানে (Dukhan Field) আবিষ্কৃত হলো তেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তেল রপ্তানি আরম্ভ হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার আর নাগরিকদের হাতে আসতে শুরু করে বিপুল পরিমাণে অর্থ। টাকার জোরে দ্রুত ঘুরতে শুরু করে উন্নয়নের চাকা।
১৯৭১ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় ইংল্যান্ড, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে শুরু হয় কাতারের পথচলা। আল-থানি (Al Thani) বংশ থেকেই বংশানুক্রমে শাসনকর্তা বা আমির হয়ে আসার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ তারা বিনিয়োগ করে অবকাঠামো, শিক্ষা আর চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে।
শক্তির নতুন উৎস
মধ্যপ্রাচ্যের আরো অনেক দেশের মতো কাতারের পরিবর্তনের সূচনাও তেলের হাত ধরে, কিন্তু তাদের মূল সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই সাগরের নর্থ ফিল্ড এলাকায় সন্ধান পাওয়া যায় নতুন এই সম্পদের।
নর্থ ফিল্ড পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার, যা প্রায় চার হাজার স্কোয়ার মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত-কাতারের মোট স্থলভাগের প্রায় অর্ধেক। এখানে আনুমানিক ৯০০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস তুলে নেয়ার অপেক্ষায় আছে। গ্যাসের এই উৎস অবশ্য কাতারের একক মালিকানাধীন নয়, ইরানের সামুদ্রিক সীমানায় রয়েছে এর একটা বড় অংশ।
তবে গ্যাস থাকাই যথেষ্ট নয়। এর উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি খরচসাপেক্ষ এবং জটিল। কেবল তেলের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার ঝুঁকি টের পেয়েছিলেন আল-থানি পরিবার। ফলে ১৯৯০ এর দশকে যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ নেন তারা। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি’তে (liquefied natural gas/LNG) বিপুল অর্থ ঢালা হয়। সেই সময় এলএনজির অবকাঠামো তৈরি এবং বিতরণব্যবস্থা ছিল বিশাল খরচের ব্যাপার। এই খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খাটিয়ে বিশাল এক ঝুঁকি নেয় কাতার। রপ্তানির জন্য তৈরি হয় কাতারগ্যাস আর রাসগ্যাস নামে দুটি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি।
দূরদর্শিতার ফলাফল দেখতে বেশি দূর যেতে হয়নি। ১৯৯৭ সাল থেকে এলএনজি রপ্তানি আরম্ভ করে কাতার। একবিংশ শতকের শুরুতে পৃথিবীর সবথেকে বেশি এলএনজি রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার পরেই ছিল তারা। ইউরোপ আর এশিয়ার বাজারের বিপুল চাহিদা মেটাচ্ছিল এই এলএনজি। হু হু করে আসতে থাকে ডলার, অর্থনীতি হয়ে ওঠে শক্তিশালী। নাগরিকদের মাথাপিছু আয়ও অনেক বেড়ে যায়, কাতার পরিণত হয় ধনী দেশগুলোর একটিতে।
২০২৪ সালে কাতারের মাথাপিছু জিডিপি ছিল বার্ষিক প্রায় ৭৭০০০ ইউএস ডলার। ১৯৭০ সালে যেখানে কাতারের জিডিপি ছিল মাত্র ৫০০ মিলিয়ন, সেখানে মাত্র পঞ্চান্ন বছরে সেটা দাঁড়ায় ২১৮ বিলিয়ন ডলারে। জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায় দ্রুত; ১৯৭০ সালে যা ছিল এক লাখ, পরবর্তী শতাব্দীতে সেটাই তিন মিলিয়ন ছুঁয়ে ফেলে। আজকের কাতারের বিলাসবহুল হোটেল, শপিং মল আর জমকালো সব আবাসন সাক্ষ্য দেয় বিত্তশালী এক রাষ্ট্রের। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ সম্ভবত রাজধানী দোহা।
বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও সুচিন্তিত বিনিয়োগ
আজকের কাতার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক দূরদর্শিতার যুগপৎ ফসল। এলএনজি খাতে তাদের বিনিয়োগ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য অত্যাধুনিক পরিশোধনাগার ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়েছিল তাদের। এলএনজি ব্যবসাতে তাদের দক্ষতা ছিল সর্বজনবিদিত। ফলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন আর ইউরোপের অনেক দেশ এই সংক্রান্ত ব্যবসায়িক চুক্তি করে তাদের সঙ্গে। এর সুফল কাতার পেয়েছিল হাতেনাতেই।
তেল-গ্যাসের বিপুল মুনাফা লুটপাট না করে কাতারি আমিররা সেটা কাজে লাগান দেশের চেহারা পাল্টে দিতে। অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা কাতার। দোহার ওয়েস্ট বে ডিস্ট্রিক্টের (West Bay district) তুলনা চলে ম্যানহাটানের সঙ্গে। আবাসন, চিকিৎসা এবং নাগরিক সুবিধাতেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করে কাতার।
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে দোহার উপকণ্ঠে গড়ে তোলা হয়েছে শিক্ষা নগরী (Education City)। বিশাল এই ক্যাম্পাসে আছে নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কাতার ফাউন্ডেশন। সিদ্রা হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র পথ দেখাচ্ছে চিকিৎসাসেবায়।
তেল আর গ্যাসের বাইরেও নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ করছে কাতার। এজন্য ২০০৫ সালেই তৈরি করা হয়েছিল কাতার বিনিয়োগ তহবিল (Qatar Investment Authority/QIA))। এই তহবিলে আছে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থের বিশাল অংশ খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিক কাজকর্মে ব্যবহৃত হয়। কাতারে আছে বিশ্বমানের ক্রীড়া (Aspire Zone sports complex), এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (Katara Cultural Village)। এসবের মূল লক্ষ্য বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। এই উদ্দেশ্যেই গত ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে দ্বিধা করেনি তারা।
তবে তেল আর গ্যাস এখনো কাতারের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ইতোমধ্যে এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে এর ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে গ্যাস উৎপাদন আরো ৪০% বাড়বে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কাতার ন্যাশনাল ভিশন-২০৩০ নামে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছে দেশটি। এর অন্যতম থিম জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির তেল ও গ্যাস নির্ভরতাক অমানো এবং টেকসই উন্নয়ন। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগ সহজ করেছে তারা। গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগজিনের তথ্য অনুসারে পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিদেশী বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে দেশটি, এমনকি শতভাগ বিদেশী মালিকানার অভাবনীয় সুযোগও দেয়া হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য শক্তিতেও টাকা খাটাচ্ছে কাতার। তাদের লক্ষ্য ২০৩০ সাল নাগাদ জাতীয় বিদ্যুতের শতকরা বিশভাগ সৌরশক্তি থেকে আহরণ করা। এজন্য বিশাল এক প্ল্যান্টও স্থাপন করা হয়েছে (Al Kharsaah Solar Power Plant)। পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য অপসারণ এবং সবুজ আবাসনের মতো পরিবেশবান্ধব নানা পদক্ষেপও নিয়েছে তারা।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব
অর্থনৈতিক পেশী এবং কৌশলগত অবস্থানের জোরে আন্তর্জাতিক পরিসরে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কাতার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংঘাতে মধ্যস্থতাকারি হিসেবে তাদের সমাদর আছে। আফগানিস্থান, সুদান আর লেবাননের সংঘাতে কাতার সমঝোতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাতেও সক্রিয় কাতার। এর অন্যতম উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (Gulf Cooperation Council), আরব লীগ, তেল রপ্তানীকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও বেশ দহরম মহরম তাদের। দোহার কাছে মার্কিনিদের নিজস্ব সামরিক বিমানঘাঁটি আছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শক্তির অন্যতম খুঁটি এই ঘাঁটি।
সংবাদমাধ্যমের শক্তিকেও নিজেদের স্বপক্ষে কৌশলে কাজে লাগায় কাতার। আল-জাজিরা মিডিয়ার উৎপত্তি দোহাতে, ১৯৯৬ সালে। বর্তমানে আরব বিশ্ব শুধু নয়, সারা পৃথিবীতেই প্রথম সারির একটি সংবাদমাধ্যম তারা।
প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার একটি দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ কাতার। এর সাথে যোগ হয়েছে কৌশলগত বিনিয়োগ, বিচক্ষণ নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা। জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি, নিজদের পরিণত করেছে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ কেন্দ্রে। তবে তেল ও গ্যাসের ওপর অধিক নির্ভরতা এখনো একটি সীমাবদ্ধতা। আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতাও একটি ঝুঁকি বটে। তবে সবকিছুর পরেও বলা যায়, আগামী কয়েক দশকে উৎকর্ষের শীর্ষে ওঠার পথেই আছে দেশটি।