ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে যুদ্ধের ধরন। শুরুর দিকে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ দেখা গেলেও বর্তমানে রুশ অধিকৃত এলাকায় ইউক্রেনের লড়াই অনেকটাই গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এই ছায়াযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন একদল নারী ও ছদ্মপরিচয়ে কাজ করা গোয়েন্দা, যাদের প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যরা ডাকেন ‘ভিদমা’ বা ‘ডাইনি’ নামে।
মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইউক্রেনের এই গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও তাদের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে থাকা এক রুশ সেনা কয়েক মাস ধরে মনে করছিলেন, তিনি এক ইউক্রেনীয় নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন নিরাপদ বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ চলছিল।
একপর্যায়ে ওই নারী তাঁর ক্যাম্পের ছবি দেখতে চান। সেনাটি ছবি পাঠানোর পর সেটির পেছনের অংশে অস্পষ্টভাবে সামরিক ঘাঁটির একটি মানচিত্র দেখা যায়।
তবে বাস্তবে ওই ব্যক্তি নারী ছিলেন না। অ্যাকাউন্টটি চালাচ্ছিলেন ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একজন পুরুষ কর্মকর্তা। ছবি পাওয়ার প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যেই ওই অবস্থান লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে রুশ সেনা বার্তা আদান-প্রদান করার সময়ই ড্রোন হামলা হয়েছে।
ইউক্রেনীয় লোককথায় ‘ভিদমা’ বলতে এমন নারীকে বোঝায়, যাঁর কাছে সাধারণ মানুষের বাইরে বিশেষ জ্ঞান রয়েছে। ইউক্রেনের সাবেক সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটস দ্য আটলান্টিককে বলেন, ইউক্রেনীয় সমাজে এমন নারীদের ডাইনি হিসেবে হত্যা করা হয়নি, বরং তাঁদের জ্ঞানকে সম্মান করা হয়েছে।
বর্তমানে এই নামে পরিচিত অনেকেই সাধারণ ইউক্রেনীয় নারী। তাঁদের কেউ বাজারে যাওয়ার অজুহাতে রুশ চেকপোস্ট পার হন, কেউ অধিকৃত এলাকার স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র বা রাশিয়ার দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পাশাপাশি তাঁরা রুশ সেনাদের চলাচল ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।
মারিউপোলের একটি প্রতিরোধ সেলের প্রধান পেত্রো আন্দ্রিয়ুশচেঙ্কো বলেন, ‘নারীরা এমন সব জায়গায় যেতে পারেন এবং এমন সব কাজ করতে পারেন, যা পুরুষদের পক্ষে অসম্ভব। তা ছাড়া তাঁরা শত্রুর প্রতি অত্যন্ত নির্মম।’
ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ সদস্যদের এমন কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেনীয় উইমেনস গার্ড নামে একটি সংগঠন ৬০ হাজারের বেশি নারীকে টিকে থাকা, আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের বিভিন্ন কৌশল শিখিয়েছে।
শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, ইউক্রেন ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া নারীরাও এই গোয়েন্দা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন। জার্মানি, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে থাকা ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের কেউ কেউ নিজেদের এলাকার পুরোনো তথ্য ব্যবহার করে ড্রোন হামলার লক্ষ্য যাচাইয়ে সহায়তা করছেন।
দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসনের রোকসানা ছদ্মনামের এক নারী বর্তমানে দেশের বাইরে থেকে লক্ষ্যবস্তু যাচাইয়ের কাজ করছেন। পরিচিত এলাকায় হামলার তথ্য দিতে খারাপ লাগে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গুদামঘর আমরা আবার বানিয়ে নিতে পারব, কিন্তু রাশিয়ানরা মরে গেলে তো আর বেঁচে ফিরবে না।’
তবে এই গোপন নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য শুধু রুশ সেনাদের ওপর হামলা নয়, বরং তাঁদের মধ্যে মানসিক চাপ ও আতঙ্ক তৈরি করাও।
মারিউপোলে ছদ্মনামে কাজ করা সেস্ত্রা নামের এক এজেন্ট বলেন, ‘আমি চাই ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা প্রত্যেক রুশ সেনা প্রতি সেকেন্ডে এই দমবন্ধ করা আতঙ্কে ভুগুক। বাজারে সবজি বিক্রি করা বয়স্ক নারী, বাসের ড্রাইভার, ক্লিনিকের ডাক্তার কিংবা সাধারণ পথচারী- সবার দিকে তাকিয়েই যেন রুশ সেনারা নিজেদের নিশ্চিত মৃত্যু দেখতে পায়।’
দ্য আটলান্টিকের পক্ষ থেকে সাবেক সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যুদ্ধে ইউক্রেনের পুরুষ শেষ হয়ে গেলে কী হবে। জবাবে তিনি বলেন, ‘সাবধান! ইউক্রেনের নারীরা যদি পুরোপুরি যুদ্ধের হাল ধরে, তবে একজন রাশিয়ানও আর বেঁচে ফিরতে পারবে না।’