Ridge Bangla

ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ছায়া: তেহরানের অভ্যন্তরে মোসাদ-বিরোধী অভিযানের কঠোরতা

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের শঙ্কা বেশ পুরনো। ইরান পরমাণু বোমার অধিকারী হওয়া মানে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা ভারসাম্যে বিশাল পরিবর্তন চলে আসা। তাদের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা দ্বন্দ্ব সম্প্রতি সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার পর তেহরানের অভ্যন্তরে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং বিদেশি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক নির্মূলের প্রচেষ্টা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশেষত সম্প্রতি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের (Mossad) এজেন্ট ও সহযোগী সন্দেহে ব্যাপক ধরপাকড় এবং দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা অনেক বেড়ে গিয়েছে। এ থেকে স্পষ্টভাবে অনুমান করা যায় যে ইরানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ছাড় দিতে এক চুলও রাজি নয়।

​এই বছরের জুনে ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যেকার ১২ দিনের প্রত্যক্ষ সংঘাতের পর তেহরান বুঝতে পারে যে তাদের সামরিক ও পরমাণু স্থাপনার ভেতরে ইসরায়েলি এজেন্টরা অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং টাইমস অফ ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (IRGC) কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে চালানো একাধিক হামলায় মোসাদের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের ভূমিকা ছিল বলে তেহরান সন্দেহ প্রকাশ করেছে। কারণ ইরানের ভেতরের এজেন্টদের সহায়তা ছাড়া এত নিখুঁত হামলা সম্ভব নয়।

মোহাম্মদ আমিন-নেজাদের মতো উচ্চপদস্থ ইরানি কূটনীতিকও স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েলিরা ইরানের ভেতরে হামলার জন্য প্রয়োজনীয় বোমা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে এবং দেশের ভেতরে লোক নিয়োগ করেছে। এটি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের বিশাল ব্যর্থতা নির্দেশ করে।

ইরানের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পেরেছেন তাদের দেশের ভেতর থেকে ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করা মানুষদের উৎখাত করতে না পারলে আরও বড় বিপর্যয় রয়েছে সামনে। তাদের এই  উপলব্ধি থেকেই বর্তমানে ইরানের ভেতরে গুপ্তচরদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করার জন্য জোরেশোরে অভিযান শুরু হয়েছে।

সরকারি তথ্যমতে, সংঘাতের পরপরই নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শত শত সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৭০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। দেশটির খুজেস্তান প্রদেশের প্রসিকিউটর অফিস ৫৪ জন গুপ্তচরকে আটকের খবর নিশ্চিত করেছে এরই মধ্যে। এই গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে মাইক্রো এরিয়াল ভেহিকেল (MAV) পরিচালনা, বিস্ফোরক তৈরি এবং স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনার ছবি তুলে ইসরায়েলের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক একাধিক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বাহমান চৌবি আসল (Bahman Choobi Asl) এবং বাবাক শাহবাজি (Babak Shahbazi)।  তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ইরানের বিচার বিভাগ চৌবি আসলকে মোসাদের ‘সবচেয়ে বিশ্বস্ত’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ’ গুপ্তচরদের অন্যতম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জাতীয় ডেটাবেসে অনুপ্রবেশ এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আমদানির পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

জুনের সংঘাতের পর থেকে ইরান কমপক্ষে ৯ জনকে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য দুটি- প্রথমত, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী শক্তিকে কঠোরতম শাস্তি প্রদান করা এবং দ্বিতীয়ত তাদের অভ্যন্তরীণ সহযোগীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে মোসাদের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তবে ​গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় তেহরানের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বারবার অভিযোগ করেছে যে অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্থ তো হয়েছেই, ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। বাহমান চৌবি আসল বা বাবাক শাহবাজির মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই অভিযোগ উঠেছে। দেশের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এই মামলাগুলো সাধারণত রুদ্ধদ্বার আদালতে পরিচালিত হয় এবং আসামিরা তাদের বিরুদ্ধে আনা প্রমাণের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে আইনি লড়াই চালানোর সুযোগ পান না।

এছাড়াও ​এই ব্যাপক ধরপাকড় এবং দ্রুত মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলি গুপ্তচর সন্দেহের আড়ালে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

​পরিশেষে বলা যায়, ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর ইরান এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে এক অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের ভেতরে মোসাদের অনুপ্রবেশের গভীরতা সরকারকে বাধ্য করেছে একটি ব্যাপক ও দ্রুত পাল্টা-গোয়েন্দা অভিযান চালাতে। এই অভিযানের ফলে যারা গ্রেফতার হচ্ছেন, তাদের পরিণতি হচ্ছে গণ-গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন।

তথ্যসূত্র

১) Iran arrests eight suspected of spying for Israel’s Mossad in 12-day war

২) Iran’s Mossad paranoia grows, amid fears of Israeli spies wearing ‘masks, hats and sunglasses’

৩) Iran executes man accused of spying for Israel, judiciary’s news outlet

This post was viewed: 31

আরো পড়ুন