কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের পাশে থাকা ১৩৬ বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
মসজিদ কমিটি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিশেষ পরিদর্শক দল ও নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকের পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) থেকেই মসজিদ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে আজ থেকে মসজিদটিতে নামাজ আদায় বন্ধ রাখা হয়েছে।
‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত শতাব্দীপ্রাচীন এই ধর্মীয় স্থাপনা বর্তমানে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও রানওয়ে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মসজিদটি বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে অবস্থিত। অথচ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি অনুযায়ী, রানওয়ে থেকে যেকোনো স্থাপনার ন্যূনতম দূরত্ব ২৪০ মিটার হওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রবল বর্ষণ বা ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে গেলে রানওয়ের খুব কাছে থাকা মসজিদের কাঠামো পাইলটদের জন্য দৃশ্যগত বিভ্রম তৈরি করতে পারে। এতে বিমান অবতরণের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রানওয়ের এত কাছে মসজিদটি থাকায় সেখানে আধুনিক ‘ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ বসানোও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিমানবন্দরের ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
মসজিদটির অবস্থানের কারণে দ্বিতীয় রানওয়ের ‘টাচডাউন পয়েন্ট’ বা বিমান অবতরণের নির্ধারিত স্থানও এগিয়ে এনে রানওয়ের কার্যকর দৈর্ঘ্য কমাতে হয়েছে। এ সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের বিমান দ্বিতীয় রানওয়ে ব্যবহার করতে পারছে না।
মসজিদটি স্থানান্তর করা হলে এসব বাধা দূর হওয়ার পাশাপাশি রানওয়ে আধুনিকায়নের পথ খুলবে বলে মনে করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
সূত্রের দাবি, মসজিদটির কারণে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ প্রায় ৩০ বছর ধরে আটকে রয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হলেও স্থানীয় আপত্তি ও রাজনৈতিক কারণে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে ঈদের নামাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ মসজিদটিতে অংশ নেওয়ায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেয় রাজ্য সরকার ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ঈদের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কায় পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পরিচালনা করা হচ্ছে। মসজিদ ও বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
মসজিদ কমিটি এর আগে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, তাদের কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হোক, তা তারা চান না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের বাইরে আরও বড় একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে সে সময় স্থানান্তরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বিধায়ক সৌরভ শিকদার বলেন, মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া ব্যক্তিদের বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। আধার কার্ড যাচাইয়ের পর বিশেষ বাসে করে তাদের রানওয়ের পাশের মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। এ জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও পরিবহন ব্যবস্থাও সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখতে হয়।
তার দাবি, মসজিদটির কারণে রানওয়ে সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না এবং বড় বিমান দ্বিতীয় রানওয়ে ব্যবহার করতে পারছে না। এতে বিমানবন্দরের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অন্য জমিতে নতুন মসজিদের জন্য স্থান নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
১৯২৪ সালে কলকাতা বিমানবন্দর চালু হয়। গৌরীপুর মসজিদের জমিটি প্রাচীন ওয়াক্ফ সম্পত্তি। ১৯৬২ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য ওই এলাকার জমি অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। সে সময় মসজিদের পাশ দিয়ে যশোর রোড চলে গেলেও বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য সড়কটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। তবে মসজিদটি থেকে যায় বিমানবন্দরের সীমানার ভেতরে, রানওয়ের পাশে।
১৯৬২ সালের জমি অধিগ্রহণের শর্ত অনুযায়ী, গৌরীপুর কালীমন্দিরের বিপরীতে একটি ছোট লোহার গেট দিয়ে মুসল্লিদের মসজিদে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়। গেটটির ওপর রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর ওয়াচ টাওয়ার।
নামাজ আদায়ে আগ্রহীদের পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বিশেষ বাসে করে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিন নির্ধারিত কয়েকটি সময়ে এ পরিবহন ব্যবস্থা চালু থাকে। বিশেষ এ ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে মসজিদটিতে যাওয়া কার্যত অসম্ভব।
This post was viewed: 4