টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নতুন করে অন্তত ১২টি গ্রামে পানি ঢুকেছে। এর আগে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ও বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নসহ আশপাশের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বন্যায় এসব এলাকার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানিতে মাছের ঘের, ফসলি জমি ও সবজিক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। পরে পর্যায়ক্রমে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘর, সড়ক ও কৃষিজমি পানির নিচে চলে যায়। আকস্মিকভাবে পানি প্রবেশ করায় বিপাকে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর খোয়াই নদীতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এতে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীররক্ষা বাঁধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। চলতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতের চাপ দুর্বল অংশে পড়ায় বাঁধ ধসে এই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তাদের দাবি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধের একটি অংশ ভাঙার পর নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর ও বনদক্ষিণ এলাকায় প্রথমে পানি ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর শুক্রবার বিকাল থেকে শনিবার বিকাল পর্যন্ত যমুনাবাদ, আউশপাড়া, সুতালনশী, আব্দাবখাই, শরিফপুর, হামিদপুর, ধনিয়াখালি, নন্দনপুর, ভাতকাটিয়া, শিয়াল দাড়িয়া, শিবপাশা ও তারাপাশাসহ নতুন করে আরও ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়। অনেক বাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, মূল্যবান সামগ্রী ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেছেন।
তবে লোকালয়ের নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি বাড়লেও জেলার সব নদ-নদীর পানি কমেছে।
লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উজ্জ্বল মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার দিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে তীররক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতের চাপ সহ্য করতে না পেরে কালিগঞ্জ এলাকার বাঁধটি ভেঙে যায়। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ জি কে গউছ বলেন, বন্যাটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কোনো মানুষের পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অতিবৃষ্টির ফলে উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে দুর্বল বাঁধ থাকার কারণে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। কয়েক হাজার পরিবার এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রশাসন, দলীয় নেতাকর্মীসহ সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ শুরু করেছি। যেগুলো দৃশ্যমান ক্ষতি হয়েছে সেগুলো আগে পূরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। অনেক স্থানে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা হবে। এসব ক্ষতি পূরণের জন্য রাষ্ট্র যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
জি কে গউছ বলেন, খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলন করার জন্য ইজারা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বালু উত্তোলন করে সরকারেরও টাকা কামানোর কোনো আগ্রহ নেই। যারাই অবৈধভাবে এই সুবিধা নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন।