উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কিম পরিবারের তথাকথিত ‘পবিত্র’ রক্তধারার কথা বারবার তুলে ধরা হলেও, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উনের মা কো ইয়ং-হুইকে রাষ্ট্রীয় প্রচারে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর জন্মপরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিতর্কই এর অন্যতম কারণ।
কিম ইল সুংয়ের স্ত্রী কিম জং সুক এবং কিম জং ইলের মা কাং প্যান সককে উত্তর কোরিয়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, কো ইয়ং-হুই কখনো সেই স্বীকৃতি পাননি। তাঁর পরিচয় ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্যময় নীরবতা বজায় রেখেছে পিয়ংইয়ং।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার প্রচারিত ধারণা অনুযায়ী কিম পরিবার ‘মাউন্ট পেকতু’ নামের একটি ‘পবিত্র’ রক্তধারার উত্তরসূরি। উত্তর কোরিয়া ও চীনের সীমান্তবর্তী এই পর্বতকে কোরীয় পুরাণে প্রথম কোরীয় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের জন্মস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যদিও অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তাঁর প্রকৃত জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়।
এই রক্তধারার অংশ হিসেবে পরিচিত হলেও কো ইয়ং-হুইয়ের জন্ম ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকা শহরে। তাঁর বাবা-মা দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান জেজু দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলে তাঁরা জীবিকার সন্ধানে জাপানে চলে যান।
পরবর্তীতে ১৯৬০-এর দশকে উত্তর কোরিয়া সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় মাত্র ১০ বছর বয়সে কো ইয়ং-হুই পরিবারের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ায় আসেন। তবে জাপান থেকে ফিরে আসা এসব কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষকে সে সময় দেশটির সমাজে নিচু দৃষ্টিতে দেখা হতো। ফলে জাপানে জন্ম নেওয়া এবং দক্ষিণ কোরীয় বংশোদ্ভূত এক নারীর সন্তান হিসেবে কিম জং-উনের ‘পবিত্র পেকতু রক্তধারা’র উত্তরাধিকারী হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কো ইয়ং-হুই উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক দল ‘মানসুদায়ে আর্ট ট্রুপ’-এর একজন খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী ছিলেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি লিখেছেন, তাঁর সৌন্দর্য ও নৃত্যশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন নেতা কিম জং ইল তাঁর প্রেমে পড়েন। সে সময় কিম জং ইল তাঁর বাবার পছন্দে শীর্ষ এক সামরিক কর্মকর্তার কন্যা কিম ইয়ং সুককে বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁর আরও একাধিক সঙ্গী ছিল।
এরপরও কিম জং ইল কো ইয়ং-হুইয়ের সঙ্গে ঘরসংসার শুরু করেন। তাঁদের সংসারেই কিম জং-উনসহ তিন সন্তানের জন্ম হয়। তবে কো ইয়ং-হুই কখনোই কিম জং ইলের আইনসম্মত বা আনুষ্ঠানিক স্ত্রী ছিলেন না। ফলে প্রচলিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁদের সন্তানদের বিবাহবহির্ভূত সন্তান হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিম জং ইলের স্বীকৃত স্ত্রী রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে থাকলেও কো ইয়ং-হুই ও তাঁর সন্তানদের রাজধানী থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর ওনসানে গোপনে রাখা হয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, কো ইয়ং-হুইয়ের জাপানি সম্পৃক্ততা, সামাজিক অবস্থান এবং তাঁর সম্পর্কের ইতিহাস প্রকাশ পেলে কিম পরিবারের প্রচারিত ঐশ্বরিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। এ কারণেই তাঁর পরিচয় জনসমক্ষে আনা হয়নি।
২০০৪ সালে প্যারিসের একটি হাসপাতালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কো ইয়ং-হুই মারা যান। তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আজ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু বা তাঁর অস্তিত্বের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
কিম জং-উনের ক্ষমতায় আসার পথও ছিল নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিম জং ইলের প্রথম ও সমাজস্বীকৃত স্ত্রী কিম ইয়ং সুকের দুই কন্যা সন্তান থাকলেও উত্তর কোরিয়ায় কখনো কোনো নারী সর্বোচ্চ শাসক না হওয়ায় তাঁরা উত্তরাধিকারের দৌড়ে এগোতে পারেননি।
অন্যদিকে সুং হেই-রিমের গর্ভে জন্ম নেওয়া জ্যেষ্ঠ পুত্র কিম জং নামকে একসময় সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু পারিবারিক একনায়কতন্ত্রের সমালোচনা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তিনি কিম জং ইলের আস্থা হারান। পরে তাঁকে দীর্ঘদিন ম্যাকাওয়ে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়।
২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিষাক্ত ‘ভিএক্স নার্ভ এজেন্ট’ প্রয়োগ করে কিম জং নামকে হত্যা করা হয়। ধারণা করা হয়, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কিম জং-উনের হাত ছিল।
এ ছাড়া কিম জং-উনের বড় ভাই কিম জং চোলও উত্তরাধিকারী হওয়ার সম্ভাব্য দাবিদার ছিলেন। তবে উত্তর কোরিয়ার সাবেক কূটনীতিক রিউ হিউন-উয়ের দাবি, আফিমে আসক্তির কারণে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। অনেকের মতে, অন্য সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের পথ থেকে সরিয়ে দিতে কো ইয়ং-হুইও নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, যাতে শেষ পর্যন্ত তাঁর মেজো ছেলে কিম জং-উনই উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসতে পারেন।