বান্দরবানের দুর্গম তিন্দু এলাকার যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষকদের বেতন জোগাতে ছুটির দিনে পর্যটকবাহী ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালাতেন, সেই তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, থানচির তিন্দু এলাকার স্কুলটিকে জাতীয়করণ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি নির্দেশ পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আজকে মহান সংসদে তিনি স্লিপ পাঠিয়েছেন। আমি জানাতে চাই, স্কুলটি জাতীয়করণ করা হবে শিগগিরই।’
বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানানো হয়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের আত্মত্যাগের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপরই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশ দেন তিনি।
দুর্গম তিন্দু ইউনিয়নের এই বিদ্যালয়টি ২০২০ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর এমবিএ ডিগ্রিধারী বামং খিয়াং মিংলেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০২১ সালে বিদ্যালয়টি স্থাপনের অনুমোদন এবং ২০২৩ সালে স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ জন শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছে।
তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় নিয়মিত বেতন আদায় সম্ভব হয় না। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া নিয়ে সংকটে ছিল বিদ্যালয়টি। বর্তমানে ৬ জন শিক্ষক নামমাত্র বেতনে এবং আরও ২ জন বিনা বেতনে পাঠদান করছেন।
এই সংকট মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে প্রতি শুক্রবার, শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে থানচি-তিন্দু বড়পাথর-রেমাক্রী নৌপথে পর্যটক পরিবহন করেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি জানান, অন্য চালক রাখলে মজুরি দিতে হয় এবং আয়ের স্বচ্ছতা থাকে না বলেই নিজেই নৌকার দায়িত্ব নিয়েছেন।
তাঁর এই উদ্যোগে বিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে নৌকা চালিয়ে ৪৯ হাজার ১০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা শিক্ষকদের বেতন হিসেবে ব্যয় করা হয়েছে। পাশাপাশি সাঙ্গু নদী পার হয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
সহকারী শিক্ষক পাওয়ার ম্রো বলেন, প্রধান শিক্ষক হয়েও বামং খিয়াংয়ের কোনো অহংকার নেই। নৌকা চালিয়ে যা আয় করেন, তা শিক্ষকদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেওয়াই মারমাও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল জানান, বিদ্যালয়ের জন্য টেকসই আয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই নৌকাটি দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদের মাধ্যমে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ এবং ছাত্রাবাস সংস্কারের কাজও চলছে। ছাত্রাবাসে খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধান শিক্ষক।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষকের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।