Ridge Bangla

তিস্তা সহযোগিতা তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, বলল চীন

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে না এবং এ ধরনের সহযোগিতা যেকোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত বলে জানিয়েছে বেইজিং। তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সমর্থন ঘোষণার পর শুক্রবার (২৬ জুন) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করা হয়।

বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, যা বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। চীন এই প্রকল্পে সাধ্যমতো সহায়তা দিতে প্রস্তুত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিস্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি অবশ্যই যেকোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা উচিত।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ‘তৃতীয় পক্ষ’ প্রসঙ্গের উল্লেখ ভারতের প্রতি একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ও অববাহিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দিল্লির দীর্ঘদিনের স্পর্শকাতর অবস্থান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হয়। ২৫-২৬ জুনের এ সফরে তাকে স্বাগত জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। সফরের সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেন।

সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, চীন তার সক্ষমতার মধ্যে তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা দ্রুত প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করবেন। এছাড়া সমুদ্র ও সামুদ্রিক সহযোগিতা আরও জোরদারে উভয় দেশ একমত হয়েছে।

তিস্তা প্রকল্পের পাশাপাশি সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, জলবায়ু ও বন্যা পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ প্রশমন এবং নদী ড্রেজিংয়ে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।

এ সহযোগিতা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী মেঘনার ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবছরের বন্যা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আশ্বস্ত করেন, চীন বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবে এবং বিএনপি সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। তিনি তারেক রহমানের প্রয়াত বাবা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তাঁরা উভয়েই চীনের অত্যন্ত ভালো বন্ধু ছিলেন।’

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘এক চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বিশ্বে কেবল একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধিত্বকারী সরকার।’ পাশাপাশি তাইওয়ানের যেকোনো ধরনের স্বাধীনতার বিরোধিতার অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ইউনান প্রদেশে চিকিৎসা পর্যটনের সুযোগ সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে চীন। ভারতের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ইউনানকে বিকল্প গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা ও যৌথ আধুনিকায়নে কাজ করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংস্থায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছে বেইজিং।

বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যের শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে।

যৌথ ঘোষণাপত্রে ২০১৭ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে চীন। পাশাপাশি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার’ মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে বেইজিং।

তবে কূটনৈতিক সতর্কতার অংশ হিসেবে যৌথ ঘোষণাপত্রে সরাসরি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। এর পরিবর্তে তাঁদের ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন