Ridge Bangla

রক্তাক্ত জুলাই: গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপি

দীর্ঘ ৩৬ দিনের অপ্রতিরোধ্য রক্তাক্ত আন্দোলনে রক্তপাত শুরু হওয়ার ২০ দিনের মধ্যেই লাশ আর রক্তের বোঝা মাথায় নিয়ে পতন হয় দেড় দশকের স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বছরের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, শেষমেশ তা গড়েছে সরকার উৎখাতের ইতিহাস।

৩৬ দিনের সেই আন্দোলনে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন সাড়ে ১৫ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালিয়ে আসা স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। শুরুতে এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

এর মধ্যে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোটার বিষয়টি সমাধান হবে আদালতে। চীন থেকে ফিরে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রভাষ আমীনের এক প্রশ্ন ঘুরে গেল সব পরিস্থিতি। তিনি বলেছিলেন, কোটা কারা পাবে? তখন শেখ হাসিনা সরাসরি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতির বাচ্চারা কোটা (চাকরি) পাবে?”

সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার” স্লোগান মুখরিত হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমাতে আলোচনার কোনো পথে না গিয়ে সরাসরি গুলি, ডিবি অফিসে ধরে এনে নির্যাতনের মতো পথগুলো বেছে নেয় তৎকালীন সরকার।

একদিকে রক্ত ঝরতে থাকে রাজপথে, মৃত্যু আর আহতের ভিড় বাড়তে থাকে হাসপাতালগুলোতে। সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে আন্দোলনের জমায়েতও।

একনজরে ফিরে যাওয়া যাক এক বছর আগে কী ঘটেছিল ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে।

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দফায় দফায় হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও সরকার সমর্থকরা। হামলায় সারা দেশে অন্তত ৪০০ শিক্ষার্থী আহত হন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই আহত হন ২৯৭ জন, যাদের অনেকেই ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। এমনকি হাসপাতালে গিয়েও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ।

ঘটনার আগের দিন, ১৪ জুলাই বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করেন। এর প্রতিবাদে সেদিন রাতেই উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রাত ১১টার পর ছাত্রী হলসহ বিভিন্ন হল থেকে শত শত শিক্ষার্থী, “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান দিতে দিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয় স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান।

পরদিন ১৫ জুলাই সকালে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, “ওরা নিজেরাই আত্মস্বীকৃত রাজাকার। এর জবাব ছাত্রলীগ দেবে।” একইদিন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন হুঁশিয়ারি দেন, “যারা নিজেদের রাজাকার বলেছে, তাদের শেষ দেখে ছাড়ব।”

এই বক্তব্যের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। নিরীহ ছাত্রীদের ওপর হামলার ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষ। রাজপথে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

সরকারের তরফে জবাব ছিল- গুলি, টিয়ারশেল আর লাঠি; এককথায় কেবলই বলপ্রয়োগ। প্রথমে ফেসবুক, পরে ইন্টারনেট বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় সরকার। তাতে হিতে বিপরীত হয়। আন্দোলনে রক্তপাত শুরু হওয়ার ২০ দিনের মধ্যেই লাশ আর রক্তের বোঝা মাথায় নিয়ে পতন হয় দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের। পালাতে বাধ্য হন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা।

This post was viewed: 40

আরো পড়ুন