ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের ৩ বাংলাদেশিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ৪৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশিকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে খুঁজছে পুলিশ। নিহতরা হলেন স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের ৮ বছর বয়সী কন্যা। হামলায় গুরুতর আহত হওয়া পরিবারের ২০ বছর বয়সী ছেলে বর্তমানে শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রোমের পিনেতা সাচেত্তি এলাকার কাছে ভিয়া মন্তিলিও ৩৫ নম্বর সড়কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা একটি চাপাতি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন কামাল উদ্দিন (৩৯), তাঁর স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাঁদের মেয়ে আরিশা (৮)। হামলায় আহত অয়ন (২০) বর্তমানে রোমের পলিক্লিনিকো অগস্তিনো জেমেলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, তাঁর অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত। আগামী সপ্তাহে নিহত ৩ জনের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে রোম পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশের ধারণা, পূর্বপরিচিত হওয়ায় হামলাকারীকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন কামাল ও আরজু। পরে ঘরের ভেতরে কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হামলাকারী সঙ্গে থাকা ধারালো চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন।
এ সময় বাধা দিতে গেলে অয়নও গুরুতর আহত হন। পরে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন। তদন্তকারীরা অ্যাপার্টমেন্টের দেয়াল ও সিঁড়িতে তাঁর রক্তের দাগ এবং ধস্তাধস্তির আলামত পেয়েছেন। অয়নের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরের একটি বেসরকারি পার্কিং এলাকায় রক্তমাখা একটি হুডি উদ্ধার করেছে ফরেনসিক বিভাগ। পুলিশের ধারণা, পালানোর সময় সেটি ফেলে যান হামলাকারী।
তদন্তে শাহাদাত হোসেন (৪৩) নামের এক বাংলাদেশিকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি নিহত পরিবারের বড় ছেলে অয়নের সহকর্মী এবং পরিবারের পূর্বপরিচিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
পুলিশের তথ্যমতে, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শাহাদাত দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করছিলেন। ঘটনাক্রমে হত্যাকাণ্ডের দিন সকালেই ফ্রোসিনোনের ইমিগ্রেশন অফিস তাঁকে রাজনৈতিক শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে বসবাসের অনুমতি দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহাদাত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক পদেও ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের আগে শাহাদাত তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছিলেন, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে, অন্যকে মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’
আহত অয়ন পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি ও শাহাদাত একই সুপারমার্কেট চেইনে কাজ করতেন। ঘটনার পর থেকেই শাহাদাত পলাতক রয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে ড্রোন ও ইনফ্রারেড ক্যামেরা ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের মুঠোফোনের তথ্য এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
রোম পুলিশের স্কোয়াড মোবাইলের তদন্ত কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের পেছনে একাধিক সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি সম্ভাবনা হলো পরকীয়াজনিত আক্রোশ। পুলিশের ধারণা, সন্দেহভাজন শাহাদাত কামালের স্ত্রী আরজুর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তদন্তে এ তথ্যের সত্যতা মিললে মামলাটি নারী নির্যাতনজনিত হত্যা হিসেবে আরও কঠোর ধারায় পরিচালিত হতে পারে।
এ ঘটনার পর ভিয়া মন্তিলিও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কামাল উদ্দিন অত্যন্ত ভদ্র ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইতালীয় প্রতিবেশী বলেন, ‘কামালকে আমরা সবাই চিনতাম। তিনি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। প্রায়ই তাঁকে স্থানীয় সুপারমার্কেটে বয়স্ক মানুষদের ব্যাগ গোছাতে বা কেনাকাটায় সাহায্য করতে দেখতাম। আর তাঁর স্ত্রী আরজু প্রতিদিন সকালে ছোট মেয়েটিকে নিয়ে এই কাছের স্কুলেই যেতেন। কী থেকে কী হয়ে গেল, আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না।’
অয়নের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হৃদয় মিয়া বলেন, ‘আমরা বাতিস্তিনির মাঠে একসঙ্গে ফুটবল খেলতাম। অয়ন খুবই শান্ত ও হাসিখুশি ছেলে। সে ৭ নম্বর জার্সি পরে খেলত। চলতি টুর্নামেন্টে আমাদের ফাইনাল খেলা রয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পর আমরা শোকাহত। আগামীকালের খেলায় ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে আমরা মাঠে এক মিনিটের নীরবতা পালন করব।’
রোম প্রসিকিউটর অফিস এই ঘটনায় হত্যা ও গুরুতর শারীরিক আঘাতের অভিযোগে মামলা করেছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো হচ্ছে।