দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণের সর্বশেষ হিসাবের পাশাপাশি তা পুনরুদ্ধারে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩১ মে পর্যন্ত সিআইবি ডাটাবেইজে ব্যাংকগুলোর পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে খেলাপি ঋণের এ হিসাব নিশ্চিত করা হয়েছে।
হিসাবের আওতায় রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।
সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমানো প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের হার কমাতে শ্রেণীকৃত ঋণ নিষ্পত্তি কৌশলসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যমান ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদের কাজ চলছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান-৯ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বার্ষিক আর্থিক বিবরণীর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে দেওয়া জামানতের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা পর্যালোচনা করে হালনাগাদ, শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতার নীতিমালা প্রণয়ন এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতি হালনাগাদের প্রক্রিয়া চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে সর্বোচ্চ কত ঋণ নিতে পারবেন, সেই সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে নেওয়া কিছু ব্যবস্থা অন্য শ্রেণির খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করা হচ্ছে।
অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণগ্রহীতারা রিটের মাধ্যমে যেন ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজও চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি আরও জানান, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব অথবা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের কার্যকর ও সময়োপযোগী সমাধানের কাঠামো গড়ে তুলতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা শক্তিশালী করতে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সংশোধনী আইন ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে চেক জালিয়াতি ও চেক প্রত্যাখ্যানসংক্রান্ত মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, স্বচ্ছ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা—এই ৩টি উপাদান সম্মিলিতভাবে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।