Ridge Bangla

বাড়ছে বেকারত্ব: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নাকি ডেমোগ্রাফিক বোঝা?

৫৬ হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে প্রতিনিয়ত ভয়াবহভাবে পিষ্ট হচ্ছে দেশটি। জনসংখ্যার এই বাস্তবতাকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরেই যুবশক্তির দেশ বলা হচ্ছে। আদতে এই জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে দেশের সম্ভাবনা রয়েছে বিপুল। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখন চ্যালেঞ্জে রূপ নিচ্ছে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতি ও সমাজের জন্য এক গুরুতর উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে। ২০২৪ সালে বেকারত্বের হার দাঁড়ায় প্রায় ৪.৭%, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এই হার আরও বেড়ে হয় ৪.৬৩%। সংখ্যার দিক থেকে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট।

এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের উপরে পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮.৮৫ লাখই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া গ্রাজুয়েটদের মধ্যে ২০% নারীও রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বেকারদের বড় অংশই তরুণ। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ১৫-২৯ বছর বয়সী প্রায় ১৯.৪ লাখ তরুণ বেকার, যা মোট বেকারের প্রায় ৭৯%।

বাংলাদেশে এখন ‘শিক্ষিত বেকার’ একটি বড় বাস্তবতা। একটা সময় মনে করা হতো যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোলেই চাকরি নিশ্চিত। কিন্তু এখন সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.৫%। অর্থাৎ, বেশি শিক্ষিত হলেই যে বাজারে চাকরি মিলবে, সেই নিশ্চয়তা এখন আর নেই। পড়াশোনা শেষ করার পরও চাকরি না মেলার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের প্রমাণ।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলছে না। পাঠ্যক্রমের কারিকুলাম চাকরির বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে পারছে না। ফলে ডিগ্রি থাকলেও চাকরি মিলছে না। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা ও সফট স্কিলের ঘাটতি এখানে বড় সমস্যা। এদিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। যার ফলে উঠতি যুবকরা চাকরি না পেয়ে বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রায় ৮৪% মানুষের কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে। এই খাতে চাকরির নিরাপত্তা কম, ক্ষেত্রবিশেষে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল। আয় অনিশ্চিত, ফলে অনেকেই একে চাকরি হিসেবে গণ্য করেন না। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সেই তুলনায় নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে না। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে এই তালিকায় শিক্ষিত নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি বেকারত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে চাকরির বাজারের সংকট শুধু শহরাঞ্চলে নয়, বরং গ্রামীণ এলাকাতেও কর্মসংস্থানের সংকট বাড়ছে।

বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হতে পারে। বেকারত্বের ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা ও মানসিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশমুখী হচ্ছে। দেশের মেধাগুলো বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এতে করে কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোকের সংকট তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। বেকারত্বের ফলে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। চাকরি না পেয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিংবা বেকারত্বের ঝুঁকির ফলে ভবিষ্যতে চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এসবের ফলে পরিবার ও সামাজিক কাঠামোতে চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অর্ধেকের বেশি তরুণ বিদেশে চলে যেতে আগ্রহী, কারণ দেশের চাকরির বাজারে চলমান অস্থিরতা ও ঝুঁকি, যা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ ঝুঁকিকে বাড়াচ্ছে। এতে করে মেধাশূন্যতার মুখে পড়তে পারে দেশ।

বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, যার আওতায় আইসিটি, কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তার মাধ্যমে যুব ঋণ ও স্টার্টআপ ফান্ড প্রদান করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগ আরও সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশ থেকে বেকারত্ব হ্রাস করতে আরও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কারের মাধ্যমে চাকরিমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা জরুরি। উদ্যোক্তা তৈরি করার চেষ্টা করতে হবে। এর মাধ্যমে চাকরি খোঁজার বদলে চাকরি তৈরির মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে চাইলে আইটি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামে শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, যাতে শহরমুখী চাপ কমে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে সীমিত কর্মসংস্থান। এই বাস্তবতা যদি সঠিকভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তবে এটি অর্থনীতির জন্য ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ না হয়ে ‘ডেমোগ্রাফিক বোঝা’ হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সময় পরিকল্পিত নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করার।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন