রাজধানীর মিরপুরে একটি বিদেশি পিস্তল ডেলিভারি দিতে এসে গ্রেপ্তার হওয়া দুই অস্ত্র কারবারির ঘটনা যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্ত্র বাণিজ্যের এক রূঢ় প্রতিচ্ছবি। মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অস্ত্রের প্রি-অর্ডার, দর-কষাকষি, নির্দিষ্ট দামে ডেলিভারি- সবকিছুই যেন একটি সংগঠিত আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন উঠছে, দেশে কি অবৈধ অস্ত্র এখন সহজলভ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে বোঝা যায়, অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনার ধরন বদলে গেছে। মিরপুরের ঘটনায় দেখা যায়, হোয়াটসঅ্যাপে অস্ত্রের ছবি পাঠিয়ে ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী দরদাম ঠিক করা হয়। ১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর সরাসরি ডেলিভারি দিতে এসে ধরা পড়ে কারবারিরা। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, এখন ঘরে বসেই অত্যাধুনিক অস্ত্র অর্ডার দেওয়া যাচ্ছে, যা অপরাধপ্রবণতাকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।
র্যাব ও পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে উঠে এসেছে ভয়ংকর এক চিত্র। আগারগাঁও থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিন সন্ত্রাসী জানান, সীমান্তপথে আসা অস্ত্র তারা কিনে আবার ভাড়া দিতেন ১০–৩০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, অস্ত্র শুধু কেনাবেচা নয়, ‘ভাড়ায় ব্যবহারের’ একটি বাজারও গড়ে উঠেছে। এই অস্ত্রগুলো মূলত ব্যবহৃত হচ্ছে টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের মতো কাজে। ফলে অপরাধ জগতের কাঠামো আরও সংগঠিত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
অপরাধ জগতে নতুন সংযোজন হিসেবে উঠে এসেছে ‘পেনগান’ নামক কলমের মতো দেখতে ছোট একপ্রকার আগ্নেয়াস্ত্র। গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় যুবদল নেতা রাসেলের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় এই অস্ত্র ব্যবহার করা হলে আলোচনায় আসে এটি। তদন্তে জানা গেছে, প্রথমদিকে এর দাম প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো থাকলেও একাধিক হাত বদলের পর তা ৮০ হাজারে নেমে আসে। এর মূল সুবিধা হলো এটি সহজে বহনযোগ্য, চাইলেই লুকিয়ে ফেলা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অস্ত্র আইনশৃঙ্খলার জন্য এক নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অবৈধ অস্ত্রের দাম ৩–৪ গুণ বেড়েছে। আগে যে অস্ত্র ৩০–৪০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম এক থেকে দেড় লাখ টাকায় পৌঁছেছে। এভাবে অবৈধ অস্ত্রের আকাশচুম্বী চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সক্রিয়তা ও অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি (মাদক, চাঁদাবাজি) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া। অর্থাৎ বাজারে যেমন সরবরাহ আছে, তেমনি ক্রেতাও বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এসব অবৈধ অস্ত্রের বড় অংশই আসছে সীমান্তপথে, বিশেষ করে ভারত থেকে। তবে কারবারিরা এখন তাদের কৌশল বদলেছে। আগে যেখানে বেনাপোল-যশোর-ঢাকা রুট বেশি ব্যবহৃত হতো, এখন সেখানে বেনাপোল থেকে খুলনা হয়ে ঢাকায় অস্ত্র আনা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বেনাপোল (যশোর), গোদাগাড়ী (রাজশাহী), দৌলতপুর (কুষ্টিয়া), নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান), খড়ের দ্বীপ (কক্সবাজার) ও শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)। মূলত এই রুটগুলো ব্যবহার করে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করায় তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশ ৭২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে, এর মধ্যে ২৫টি বিদেশি পিস্তল। এ সময়ে সারা দেশে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে ৫৯৭টি। এছাড়াও বিজিবি তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সীমান্ত থেকে জব্দ করা হয়েছে ১৬টি রাইফেল, ৫টি রিভলভার ও ৯০টি পিস্তল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে আরও ১৪টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। ঢাকা শহরে সন্ত্রাসীদের উপদ্রব ও অস্ত্র বেচাকেনার তালিকা তৈরি করে পুলিশ পল্লবী, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, ওয়ারী, কাফরুল, গেন্ডারিয়া, তুরাগ ও যাত্রাবাড়িকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লুট হওয়া ১,৩২৩টি অস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গুলি এখনো উদ্ধার না হওয়া। শুরু থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, এই অস্ত্রগুলো কোনো বেপরোয়া সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হাতে পড়েছে। পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, অবৈধ অস্ত্রের কোনো পূর্ণাঙ্গ হালনাগাদ তালিকা নেই। ফলে মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অস্ত্র কারবারিরা কাটআউট পদ্ধতি ব্যবহার করায় মূল হোতাদের শনাক্ত করাও কঠিন। এই পদ্ধতিতে সরাসরি যোগাযোগ না রেখে বিভিন্ন স্তরের মাধ্যমে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগে দেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ঢুকেছে, যার স্রোত এখনো বহমান। এর পাশাপাশি নয়া রাজনৈতিক মেরুকরণ এই চাহিদা আরও বাড়িয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের অস্ত্র পাচার ও বেচাকেনার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদার, অস্ত্রধারী ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্তকরণ, সীমান্ত এলাকায় বিশেষ তদারকি। বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং শুটারদের তালিকা তৈরির মাধ্যমে মূল কারবারিদের ধরার চেষ্টা চলছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, কেউ নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর অপছন্দের তালিকায় পড়লে তাকে লক্ষ্য করে টার্গেট কিলিং, এবং চাঁদাবাজির মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। বিভিন্ন সময়ে কিছু কিছু অপরাধী ধরা পড়লেও অস্ত্র সরবরাহকারী চক্র থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ। প্রযুক্তির ব্যবহার, সীমান্ত দুর্বলতা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে।