Ridge Bangla

ঢাকার রিকশা: ঐতিহ্যের বাহন থেকে ‘বিপদের চাকা’

যান্ত্রিক নগরীর কোলাহলময় সকালে ঢাকার প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয় রিকশার বেলের টুংটাং শব্দে। একসময় যেটি শুধুই এক পরিবহন মাধ্যম ছিল, এখন সেটি রাজধানীর সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও লাখো মানুষের জীবিকার প্রতীক। প্রতিদিন প্রায় এক কোটি মানুষ রিকশায় চলাচল করে। অথচ অনুমোদিত সংখ্যা মাত্র ৭৯ হাজার, বাকি কয়েক লাখই অননুমোদিত।

রিকশার উৎপত্তি ও বিবর্তন নিয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯ শতকের শেষের দিকে জাপানে এর সূচনা হয়। বাংলাদেশে প্রথম রিকশার চলাচল শুরু হয় ১৯৩৮ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শহরমুখী নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষের অল্পতেই আয়ের সুযোগ, কাগজপত্র ও দীর্ঘমেয়াদি ঝামেলা ছাড়াই জীবিকা নির্বাহের সহজ মাধ্যম হওয়ায় রিকশা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শহরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করতে রিকশা এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। বিদেশি পর্যটকরাও বাংলাদেশে এলে রিকশায় চড়ার অভিজ্ঞতা নিতে চান। অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলের ভূমিহীন কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য রিকশা উপার্জনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে চালকরা দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। এর সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক গ্যারেজ-মালিক, রিকশা মালিক, মেকানিক ও খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রেতারও কর্মসংস্থান হয়।

রিকশা এখন কেবল পরিবহন নয়, ঢাকার শিল্প-সংস্কৃতিরও অংশ। রঙিন নকশা, সিনেমার চরিত্র কিংবা লোকজ দৃশ্য আঁকা রিকশা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফোক আর্ট হিসেবে বিবেচিত।

তবে গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার নগরে নতুন সংকট তৈরি করেছে। প্রথমে গ্রামাঞ্চলে চললেও সহজলভ্যতা ও সস্তা ভাড়ার কারণে তা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো ইন্ডিকেটর ছাড়াই অতিরিক্ত গতি ও নিরাপত্তাহীনতায় দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে।

২০২৩ সালে দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৪ শতাংশ ঘটেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের কারণে। ঢাকায় প্রতি মাসে গড়ে ৫০–৬০টি দুর্ঘটনায় এ বাহন জড়িত থাকে। এআরআই-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯০০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫৮২টি ছিল প্রাণঘাতী। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, অননুমোদিত রিকশার কারণে ২০২৩ সালে ৩,৩০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

২০২৪ সালে ঢাকায় ঘটা ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৬ জন মারা যান। জাতীয়ভাবে এই তিন চাকার কারণে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৩৯২ জনে, যা মোট নিহতের ১৯ শতাংশ।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। চালকদের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক চাপ ও বিকল্প গণপরিবহন না থাকায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কার্যকর গণপরিবহন না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে এসব অবৈধ বাহনের ওপর নির্ভর করছে।

ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে বৈধ কাঠামো থাকলেও বাংলাদেশে এখনো কোনো স্পষ্ট নীতি নেই। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

রিকশা ঢাকার ঐতিহ্য ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার প্রতীক হলেও ব্যাটারিচালিত সংস্করণটি সড়ক নিরাপত্তার বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই সঠিক নীতি ও পদক্ষেপ না নিলে নগরজীবনের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে।

This post was viewed: 32

আরো পড়ুন