মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করছে ইরান- এমন দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির পক্ষ থেকে এ–সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য আসেনি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত নীতিকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যেই এমন তথ্য দিয়েছে ইসরায়েল।
আল জাজিরার বরাতে জানা যায়, শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই বিষয়ে সিএনএন জানিয়েছে, ইসরায়েল যে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে, তা ট্রাম্পকে হত্যার একটি ‘নির্দিষ্ট পরিকল্পনা’ সম্পর্কিত।
যদিও এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিংবা ইরান কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এর আগে ওয়াশিংটন একাধিকবার দাবি করেছিল, ট্রাম্পকে হত্যার ইরানি কয়েকটি প্রচেষ্টা তারা নস্যাৎ করেছে।
চলতি সপ্তাহে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কের আঙ্কারায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পও দাবি করেন, ইরান তাকে হত্যার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রেখেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ২টি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ইরান সম্প্রতি ট্রাম্পকে হত্যার একটি নতুন পরিকল্পনা করেছে এবং সেই তথ্যই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে ইসরায়েল।
একটি সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয় ইসরায়েল। অন্য একটি সূত্রের ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইসরায়েলের দেওয়া তথ্যটি ছিল নতুন এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেই ইসরায়েল এ তথ্য দিয়ে থাকতে পারে।
ইসরায়েলের দাবি করা পরিকল্পনার বিস্তারিত তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ২টি সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি এই সতর্কবার্তা পাওয়ার আগে তারা এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার বিষয়ে নজরও রাখছিল না।
২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই প্রতিশোধ হিসেবে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে বলে সতর্ক করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের দিকেই ইঙ্গিত করেছে।
গত বুধবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাকে, অর্থাৎ আমাকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের সব তালিকাতেই আছি। আজ সকালে দেখলাম, আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় রয়েছি। এখন পর্যন্ত হয়তো আমি ভাগ্যবান, কিন্তু সেটা কতদিন থাকবে জানি না। তারা ভয়ংকর মানুষ। এই ক্যানসারকে নির্মূল করতে হবে। ক্যানসারকে শুরুতেই কেটে ফেলতে হয়।’
পরে ট্রাম্প আরও বলেন, সম্প্রতি তিনি জানতে পেরেছেন, ইরানের হত্যার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় তার নাম সবার ওপরে রয়েছে। তবে তিনি ইসরায়েলের দেওয়া নতুন গোয়েন্দা তথ্যের কথাই উল্লেখ করেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সম্প্রতি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ ট্রাম্পের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে স্লোগান দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর দুই দেশ পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকি অব্যাহত রেখেছে।
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত ২টি সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি পক্ষ হামলার বিষয়ে আলোচনা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের একজনের দাবি, বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উদ্বিগ্ন।
তবে ওই সূত্রের মতে, ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যকে অনেকে ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখছেন। মার্কিন গোয়েন্দা মহলের একটি অংশ এ ধরনের তথ্যের ক্ষেত্রে সব সময়ই সতর্ক অবস্থান নেয়।
ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতপার্থক্যের খবর পাওয়া গেছে।
তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছে। শিগগিরই ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন নেতানিয়াহু।
এদিকে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক হামলা এবং ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও পর্দার আড়ালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে একটি পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রয়োজন হলে বৃহস্পতিবার রাতেই হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে কূটনীতিকে সুযোগ দিতে আপাতত সেই পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে।
সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে থাকা যুদ্ধবিমানগুলোকে অস্ত্রে সজ্জিত করা হয় এবং পাইলটরা মহড়া চালান। জাহাজটির কমান্ডিং কর্মকর্তা ড্যান কিলার নাবিকদের বলেন, পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
সিএনএন জানিয়েছে, এসব প্রস্তুতির পাশাপাশি যুদ্ধবিমানগুলো দিন-রাত প্রতিরক্ষামূলক টহলও অব্যাহত রেখেছে।