ইরানের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও নতুন কোনো হামলায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। ফলে বিস্ফোরণের উৎস ও কারণ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের আধা-সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মেহর নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) গভীর রাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা বুশেহর শহর এবং পাশের চোগাদাক এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে।
এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের কোনারাক শহরেও আরও ৩টি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। তবে কিছু সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড আল জাজিরাকে জানায়, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানে তারা কোনো হামলা চালায়নি।
গত মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এ সময় কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে জুনের মাঝামাঝি হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মেহর নিউজ এজেন্সি বিস্ফোরণের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। একই সঙ্গে বন্দর আব্বাস শহরে বিস্ফোরণের যে খবর তারা আগে প্রকাশ করেছিল, সেটিও পরে প্রত্যাহার করেছে।
বুশেহরের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক উপ-গভর্নর এহসান জাহানিয়ান রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আইআরএনএকে বলেন, শহরে শোনা বিস্ফোরণের শব্দ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার কারণে হয়েছে। তিনি জানান, বুশেহর শহরের উপকণ্ঠে একটি সামরিক সদর দপ্তরে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।
এদিকে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ সম্পর্কেও তাকে অবহিত করেছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ইসরায়েলের হাতজেরিম বিমানঘাঁটিতে বিমানবাহিনীর গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়নি। সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আকাশসীমায় আধিপত্য ধরে রাখা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম ভিত্তি।’
ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এখনও শেষ হয়নি। তার ভাষ্য, ‘নতুন পরিকল্পনা তৈরি রয়েছে। সামনে আরও বড় ধরনের অভিযান হতে পারে। প্রস্তুত থাকুন।’
একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। আকাশে আবারও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারও ইরানে হামলা চালিয়ে হুমকি দূর করতে আমরা প্রস্তুত।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর নতুন করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়। কাতার ও সৌদি আরবের জাহাজসহ কয়েকটি জাহাজ ওমান উপকূলসংলগ্ন নৌপথ দিয়ে চলাচলের সময় হামলার শিকার হয়।
ইরান চায়, সব জাহাজ তাদের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করুক। অন্যদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলো যৌথ বিবৃতিতে জাহাজ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান। ট্রাম্প চান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে সেখানে দ্রুত স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু হোক। অন্যদিকে ইরান এমন কোনো পদক্ষেপে রাজি নয়, যাতে প্রণালিটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমে যায়।
জাহাজে হামলার পর ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে ‘নোংরা লোক’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই ওই সমঝোতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়নি।
একই সঙ্গে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আপাতত শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে সেই প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া একটি ছাড়ও প্রত্যাহার করেছে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।