ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের আবারও দেশে প্রবেশের অনুমতি দিতে তেহরান সম্মত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৪০ দিনের সংঘাত ও কয়েক দফা অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতির পর গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর ভিত্তিতেই দুই দেশের মধ্যে নতুন আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সুইজারল্যান্ড থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, স্থায়ী সমঝোতার লক্ষ্যে ৬০ দিনের কারিগরি আলোচনা চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরবর্তী ধাপের আলোচনাও সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে।
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য খুব ভালো ভিত্তি স্থাপন করেছি। চূড়ান্ত চুক্তি হলো একটি বাড়ির মতো; আমরা এখনো বাড়িটি তৈরি করিনি, তবে একটি ভালো ভিত্তি তৈরি করেছি।’
এদিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, ইরানের তেল উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ২১ আগস্ট পর্যন্ত সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালীতে ‘মুক্ত ও নির্বিঘ্ন চলাচল’ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ফেরার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সমাধানে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানান, পারমাণবিক বিষয় নিয়ে খুব সীমিত আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো বিস্তারিত বা পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু হয়নি।
অন্যদিকে জেডি ভ্যান্সের দাবি, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের পুনরায় আমন্ত্রণ জানাতে রাজি হয়েছে ইরান। বিষয়টিকে তিনি ‘একটি বড় অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের পথে এটি প্রথম পদক্ষেপ।
২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার কিছু অংশ বন্ধ করে দেয় ইরান। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়। তবে নভেম্বর পর্যন্ত কিছু পরিদর্শন কার্যক্রম চালু ছিল।
সমঝোতার আওতায় ইরানের কিছু সম্পদ ছাড়ের ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো সম্পদ অবমুক্ত করা হয়নি।
তিনি বলেন, সম্ভাব্যভাবে এসব অর্থ মার্কিন পণ্য কেনায় ব্যবহার হতে পারে এবং তা ‘সন্ত্রাসে নয়, কৃষকদের সহায়তায় কাজে লাগবে।’
এর কিছু সময় পরই ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা ২১ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিতের ঘোষণা দেয় মার্কিন ট্রেজারি।
এদিকে আলোচনার অগ্রগতির মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে লেবানন ঘিরে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। তবে রবিবারের পর থেকে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত রয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান জানিয়েছে, চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য ৬০ দিনের একটি রোডম্যাপ নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে। পাশাপাশি কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
হরমুজ প্রণালীতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননে নতুন করে সংঘাত ঠেকাতে একটি সমন্বয় সেল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল, অবরোধ প্রত্যাহার এবং কিছু জব্দ সম্পদ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়নের বড় পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার আগে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও সোমবার নাগাদ দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত দেখা গেছে।
ইসরাইলের সামরিক প্রধান জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ বর্তমানে ‘কঠিন অবস্থায়’ রয়েছে। তবে তারা আর আগের মতো শক্তি পুনর্গঠন করতে পারবে না।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪,১০০ ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি আলোচনায় এখনো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ভবিষ্যতে এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।