Ridge Bangla

ডুরান্ড লাইন: পশতুনদের হৃদয়ে স্থায়ী বিভাজন এঁকেছে যে রেখা

​মানচিত্রের ওপর টানা একটি সরু রেখা যে কতটা রক্তক্ষয়ী হতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ‘ডুরান্ড লাইন’। প্রায় ২৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিতর্কিত সীমান্ত রেখাটি আধুনিক পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে চিহ্নিত। তবে রাজনৈতিক দলিলের বাইরে এটি পশতুন জাতির জন্য এক বিয়োগান্তক উপাখ্যান। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশদের কূটকৌশলে টানা এই রেখাটি কেবল দুটি দেশের ভূখণ্ডকেই আলাদা করেনি, বরং এটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে একই রক্ত, একই ভাষা এবং একই সংস্কৃতির ধারক পশতুন জনগোষ্ঠীকে। পশতুনদের কাছে ডুরান্ড লাইন কোনো সীমানা নয়, বরং তাদের হৃদয়ের বুক চিরে চলে যাওয়া এক গভীর ক্ষত।

​ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: একটি পরিকল্পিত বিভাজন

​ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের আধিপত্য তুঙ্গে, তখন রুশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণমুখী বিস্তার নিয়ে ব্রিটিশরা শঙ্কিত ছিল। এই ‘গ্রেট গেম’-এর অংশ হিসেবে ব্রিটিশ ভারত এবং রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি ‘বাফার স্টেট’ বা মধ্যবর্তী রাষ্ট্র তৈরির প্রয়োজন পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৯৩ সালের ১২ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগানিস্তানের আমির আবদুর রহমান খানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

​চুক্তি অনুযায়ী আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যবর্তী সীমানা নির্ধারিত হয়, যা বর্তমানে ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এই চুক্তি আমিরের ওপর অনেকটা জোর করেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমির চেয়েছিলেন ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি হারিয়েছিলেন পশতুন জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশকে।

​পশতুনদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

​ডুরান্ড লাইনের সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হলো এটি জাতিগত বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের তোয়াক্কা করেনি। পশতুন জাতি ঐতিহাসিকভাবে খাইবার পাস ও সুলেমান পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে আসছে। ডুরান্ড লাইন এই অঞ্চলটিকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। পশতুনদের এক অংশ পড়ে বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে, আর অন্য অংশ রয়ে যায় আফগানিস্তানে।

​এই বিভাজনের ফলে হাজার বছরের পুরনো পশতুন উপজাতীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে। এমনও দেখা গেছে, একটি গ্রামের মাঝখান দিয়ে অথবা একটি পরিবারের ঘরের ভেতর দিয়ে এই রেখা চলে গেছে। পশতুনদের জন্য তাদের গোত্রীয় পরিচয় (Tribal Identity) জাতীয় পরিচয়ের চেয়েও শক্তিশালী। কিন্তু ডুরান্ড লাইন সেই গোত্রীয় ঐক্যকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আফ্রিদি, ওয়াজিরি কিংবা মেহসুদদের মতো বড় পশতুন গোষ্ঠীগুলো এই রেখার কারণে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

​আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী অস্বীকৃতি

​১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে এবং পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন আফগানিস্তান ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। আফগানদের দাবি ছিল, ১৮৯৩ সালের সেই চুক্তিটি ছিল ব্রিটিশদের সাথে করা একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সাথে সাথেই সেই চুক্তির বৈধতা হারিয়েছে। ​পরবর্তীকালে আফগানিস্তানের প্রতিটি সরকার, তা রাজতন্ত্র হোক, কমিউনিস্ট শাসনামল হোক কিংবা আজকের তালেবান শাসন- সবাই ডুরান্ড লাইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে, এই রেখা পশতুনদের অধিকার হরণের একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার। পাকিস্তান বারবার এই সীমানাকে বৈধতা দিতে চাপ দিলেও কাবুল আজ অবধি তা স্বীকার করেনি, যা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এক স্থায়ী তিক্ততার জন্ম দিয়েছে।

পশতুনিস্তান আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদ

​ডুরান্ড লাইনের এই কৃত্রিম বিভাজনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেয় ‘পশতুনিস্তান’ বা স্বতন্ত্র পশতুন রাষ্ট্রের ধারণা। খান আবদুল গাফফার খান বা ‘সীমান্ত গান্ধী’র মতো নেতারা পশতুনদের হারানো অধিকার ও ঐক্যের কথা তুলে ধরেন। পশতুন জাতীয়তাবাদীদের মতে, এই রেখাটি তাদের পরিচয়কে খণ্ডিত করেছে।

​আজকের দিনেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘পশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট’ (PTM)-এর মতো সংগঠনগুলো পশতুনদের ওপর বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব। তারা মনে করে, ডুরান্ড লাইন কেবল একটি সীমানা নয়, বরং এটি পশতুনদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দাবিয়ে রাখার একটি উপায়। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত পশতুনদের কাছে এটি এক ধরনের ‘অসমাপ্ত কাজ’, যা পশতুন ঐক্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

বর্তমান ভূ-রাজনীতি ও কাঁটাতারের বেড়া

​একবিংশ শতাব্দীতে এসে ডুরান্ড লাইন আরও জটিল রূপ নিয়েছে। পাকিস্তান এই সীমান্তে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। ইসলামাবাদের দাবি, সন্ত্রাসবাদ ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এই ব্যবস্থা জরুরি। তবে এই কাঁটাতার পশতুনদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। ​সীমান্তের দুই পাশে আত্মীয়স্বজন থাকা পশতুনদের জন্য এখন যাতায়াত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে তারা বিনা বাধায় আসা-যাওয়া করতে পারত, এখন সেখানে কড়া সামরিক প্রহরা ও পাসপোর্টের জটিলতা। তালেবান ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের সাথে এই সীমানা নিয়ে বারবার সংঘর্ষ হয়েছে। তালেবান যোদ্ধারা পাকিস্তানের লাগানো কাঁটাতার উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও ‘পশতুন সত্তা’ ডুরান্ড লাইনের প্রশ্নে আজও আপসহীন।

বিভাজন বনাম সত্তা

ডুরান্ড লাইন ইতিহাসের এক এমন ট্র্যাজেডি যা শত বছর পেরিয়েও অমীমাংসিত। ব্রিটিশরা হয়তো ভারতের সুরক্ষার জন্য এই রেখা টেনেছিল, কিন্তু তারা উপলব্ধি করতে পারেনি যে পশতুনদের মন ও সংস্কৃতি কোনো কৃত্রিম রেখা দিয়ে শাসন করা সম্ভব নয়। এই রেখাটি পশতুনদের কেবল মানচিত্রেই আলাদা করেনি, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় এক স্থায়ী অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​যতদিন পশতুনদের হৃদয়ে এই বিভাজন ক্ষত হয়ে থাকবে, ততদিন ডুরান্ড লাইন কেবল একটি সীমানা হয়ে থাকবে না, বরং তা হবে বিদ্রোহ ও বঞ্চনার এক মূর্ত প্রতীক।

This post was viewed: 10

আরো পড়ুন