বাংলাদেশে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলেও তাদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ও ইতিহাস আজও আমাদের সামনে দণ্ডায়মান। এর মধ্যে তাজহাট জমিদার বাড়ি অন্যতম। রংপুর শহরের দক্ষিণ-পূর্বদিকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থাপনা পর্যটকদের আকর্ষণকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাজহাট জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রত্ন ব্যবসায়ী মান্নালাল রায়। তিনি রংপুরের মাহিগঞ্জে হীরা, স্বর্ণ এবং জহরত ব্যবসার জন্য এসেছিলেন। তার ব্যবসার শুরু বিভিন্ন ধরনের দামি হীরা, মানিক এবং জহরতখচিত টুপির বিক্রির মাধ্যমে। বিশেষ করে টুপির ব্যবসার জন্য এখানে একটি হাট বসত, এবং সেখান থেকেই ‘তাজহাট’ নামটি এসেছে। বাড়িটি সাদা রঙের বিশাল প্রাসাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যা প্রাচীন মোগল স্থাপত্যের আদলে নির্মিত।
বাড়ির মধ্যভাগে একটি বিশাল গম্বুজ রয়েছে, এবং দালানগুলোর মধ্যে একটি মসজিদ আকৃতির। এটি প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত এবং চারতলার সমান উঁচু। প্রাসাদে মোট ৩১টি সিঁড়ি রয়েছে। প্রতিটি সিঁড়ি ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখা যায় বেশ কিছু প্রদর্শনী কক্ষ, যেখানে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম রয়েছে।
এখানে রয়েছে কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যার মধ্যে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের কোরআন, মহাভারত এবং রামায়ণের মূল কপি রয়েছে। এছাড়া, পেছনের ঘরে কালো পাথর দিয়ে তৈরি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতিও রয়েছে।
প্রাসাদের চত্বরে বিশাল খালি মাঠ এবং সারি সারি গাছ রয়েছে। বাড়ির দুই পাশে দুটি পুকুরও রয়েছে। বাড়ির সামনে একটি মার্বেল ফোয়ারা আছে, যার নকশা এখন কিছুটা মলিন হলেও এর সৌন্দর্য এখনও দৃশ্যমান। কথিত রয়েছে, রানির জন্য বিশেষভাবে এই ফোয়ারা নির্মাণ করা হয়েছিল।
প্রাসাদের পেছনে একটি গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে, যা একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এই সুড়ঙ্গ সরাসরি ঘাঘট নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে সিঁড়িটি নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তাজহাট জমিদার বাড়ি ঐতিহাসিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটি ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রংপুর হাইকোর্ট এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তাজহাট জমিদার বাড়িকে একটি সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘরকে সরিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়। এখন এটি একটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখানে প্রবেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য দিতে হয়, এবং গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে আলাদা ফি দিতে হয়।
রংপুর যাওয়ার জন্য সড়কপথে ঢাকা থেকে গ্রিন লাইন, টিআর ট্রাভেলস, আগমনী পরিবহন, শ্যামলী, হানিফ, কেয়াসহ বিভিন্ন পরিবহন রয়েছে। এই পরিবহনগুলো ঢাকা থেকে রংপুরের বিভিন্ন সময়ে সার্ভিস দেয়। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে প্রতিদিন সকালে ও রাতেও বাস ছেড়ে যায়।
রংপুরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য হোটেল শাহ আমানত, হোটেল গোল্ডেন টাওয়ার, হোটেল দি পার্ক (জাহাজ কোম্পানির মোড়), হোটেল তিলোত্তমা (থানা রোড), হোটেল বিজয় এবং আরডিআরএস (জেল রোড)।
তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই স্থাপনা আজও আমাদের মধ্যে জমিদার প্রথার ইতিহাস এবং রংপুরের অতীতের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।