Ridge Bangla

তারা মসজিদ: পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত তারা মসজিদ একটি ঐতিহাসিক ও চমকপ্রদ স্থাপত্য নিদর্শন, যা এর সাদা মার্বেলের দেয়ালে নীল তারার নকশার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

১৮শ শতকের শুরুতে মির্জা গোলাম পীরের উদ্যোগে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় বলে জানা যায়। পরে এটি সিতারা মসজিদ হিসেবে পরিচিতি পায়। মুঘল শৈলীতে নির্মিত মসজিদটি ১৯৩০-এর দশকে পুনর্সংস্কার ও সম্প্রসারিত হয়। ফলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়।

তারা মসজিদ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তবে মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে, কারণ কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা শিলালিপি পাওয়া যায়নি।

মির্জা গোলাম পীর, একজন ধনী জমিদার, যিনি ঢাকার মহল্লা আলে আবু সাঈদ এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তার পূর্বপুরুষরা তুরস্ক থেকে ঢাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। মির্জা গোলাম পীরের উদ্যোগে এই মসজিদটি নির্মিত হয়, যা প্রথমে ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’ নামে পরিচিত ছিল।

একটি সাধারণ তিন গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপনা ছিল মসজিদটি, যার দৈর্ঘ্য ছিল ৩৩ ফুট এবং প্রস্থ ১২ ফুট। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গাঠনিক রূপে অনেক পরিবর্তন এসেছে, এবং তা একটি নান্দনিক স্থাপত্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

১৯২৬ সালে স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির প্রথম বড় সংস্কারকাজ শুরু করেন। তিনি উন্নতমানের জাপানি টাইলস এবং মার্বেল ব্যবহার করে একে নতুন রূপ দেন। বিশেষত, সাদা মার্বেলের ওপর নীল তারার নকশা মসজিদের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করে। এ কারণেই পরবর্তীতে এটি ‘তারা মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তারার নকশার কারণে মসজিদটি দেখতে একদম অনন্য হয়ে ওঠে, এবং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমানে তারা মসজিদ পাঁচটি গম্বুজসহ প্রায় ৭০ ফুট দীর্ঘ এবং ২৬ ফুট প্রস্থ আয়তনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ‘চিনি টিকরি’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ অলংকরণ পদ্ধতি, যেখানে চিনামাটির বাসন ও কাচের টুকরো দিয়ে মোজাইক নকশা তৈরি করা হয়।

মসজিদের দেয়ালজুড়ে ফুলদানি, গোলাপ, চাঁদ, তারা, নক্ষত্র এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির মনোমুগ্ধকর নকশা রয়েছে। এছাড়া, এর প্রবেশপথে রয়েছে পাঁচটি খিলান, যা অষ্টভুজাকৃতির স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

তারা মসজিদের সামনে একটি বিশাল তারাকৃতির ফোয়ারা রয়েছে। এর অভ্যন্তরে প্রায় ২৮৫ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। বারান্দা ও খোলা প্রাঙ্গণ মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষের নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে ঈদের সময় এখানে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে তারা মসজিদ সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াকফ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখানে একটি হেফজখানা, মক্তব এবং লিল্লাহ বোর্ডিং রয়েছে, যা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্য সামাজিক কাজও করছে। রমজান মাসে প্রতিদিন শতাধিক মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়।

সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে রাজধানীর যেকোনো স্থান থেকেই তারা মসজিদে পৌঁছানো সম্ভব। গুলিস্তান, চানখারপুল বা বাবুবাজার থেকে রিকশা বা স্থানীয় যানবাহনে আরমানিটোলা এলাকায় পৌঁছালেই দেখা মিলবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার।

This post was viewed: 7

আরো পড়ুন